চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের বিনা মূল্যের বই ছাপার ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম করায় সাতটি প্রেসকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। কালো তালিকাভুক্ত হওয়ায় প্রেসগুলো সর্বোচ্চ দুই ও সর্র্বনি¤œ এক বছর বই ছাপার কাজ করতে পারবে না। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে বই ছাপায় অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্ত প্রেসের লাইসেন্স বাতিলেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে কালো তালিকাভুক্ত প্রেসগুলোকে তাদের অনিয়মের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে সাত কর্মদিবস সময় দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশের উত্তর যুক্তিসংগত না হওয়ায় এনসিটিবির বোর্ডসভায় প্রেসগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এনসিটিবি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
গত ১০ মে রূপালী বাংলাদেশে ‘এনসিটিবির জালে ৭ প্রেস’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে পাঠ্যবই ছাপায় প্রেসগুলোর অনিয়ম ও তাদের বিরুদ্ধে এনসিটিবির কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
যে সাতটি প্রেস কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে সেগুলো হলোÑ মাধ্যমিক স্তরে আমাজন প্রিন্টার্স, বর্ণমালা প্রেস, হাক্কানী প্রিন্টার্স, সোহাগী প্রিন্টার্স ও পিবিএস প্রিন্টার্স। প্রাথমিক স্তরে রয়েছে টাঙ্গাইল প্রিন্টার্স ও নাহার প্রিন্টিং প্রেস।
জানা গেছে, নিয়মানুযায়ী প্রতিনিধিদলের সরেজমিন পরিদর্শন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মাতুয়াইলের আমাজন প্রিন্টিং প্রেসকে চলতি শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের নবম শ্রেণির ৬ লাখের বেশি বই ছাপানোর কাজ দেয় এনসিটিবি। পরে বই ছাপার সময় মাতুয়াইলের ওই ঠিকানায় প্রেসের কোনো অস্তিত্ব পায়নি এনসিটিবির প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধিদলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজস্ব প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে কাজ নিয়ে জালিয়াতি করে অন্য প্রতিষ্ঠানে বই ছাপানোর কাজ করেছে প্রেসটি। এনসিটিবি এই কাজকে ‘প্রতারণামূলক’ আখ্যা দিয়ে আমাজন প্রেসকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। একইভাবে বর্ণমালার বিরুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী দুটি লটের বই ছাপতে না পারা, হাক্কানী প্রিন্টার্সের বিরুদ্ধে কাটার মেশিন না থাকা এবং পরিবেশ ভালো না হওয়া, পিবিএস প্রিন্টার্সের বিরুদ্ধে বই ছাপার চূড়ান্ত সময়ে ওষুধ কোম্পানির লিফলেট ছাপানো, সোহাগী প্রিন্টার্সের ভৌত অবকাঠামো সন্তোষজনক না হওয়া, নাহার প্রেসের বিরুদ্ধে খারাপ বই ছাপা ও টাঙ্গাইল প্রেসের বিরুদ্ধে পুরোনো মেশিনে বই ছাপার অভিযোগ রয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু স্বাক্ষরিত আমাজন প্রিন্টার্সকে দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়, ‘২০২৫ শিক্ষাবর্ষের দরপত্র মূল্যায়নের সময় এনসিটিবির প্রতিনিধিদল আপনার প্রদত্ত ঠিকানায় সরেজমিন পরিদর্শন করে মুদ্রণ ও বাঁধাই চালু অবস্থায় দেখতে পায়। পরবর্তীতে মুদ্রণকালীন ওই ঠিকানায় প্রেসের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এটি একটি প্রতারণামূলক কর্মকা- বিধায় পিপিআর বিধি, ২০২৫-এর ১৪৯ (৩) ধারা মোতাবেক আপনার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না...?’ আমাজনের মতো একইভাবে বাকি ছয়টি প্রেসকেও তাদের অনিয়মের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিশ দেয় এনসিটিবি। উত্তর দেওয়ার জন্য সাত কর্মদিবস সময় দিয়ে গত ৩ মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। উত্তর পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে সন্তুষ্ট না হওয়ায় প্রেসগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় এনসিটিবি।
সূত্র জানায়, অনিয়ম পর্যালোচনা করে আমাজন প্রেসকে সর্বোচ্চ ২ বছর ও বাকি ৫ প্রেসকে এনসিটিবির বই ছাপার কাজে ১ বছর জন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। উল্লিখিত সময়ে প্রেসগুলো বই ছাপা সংক্রান্ত কোনো ধরনের কাজে যুক্ত হতে পারবে না।
এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আইন ও বিধান অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হয়েছে।’ ভবিষ্যতের জন্য এই শাস্তি একটি দৃষ্টান্ত হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘অনিয়ম করলে শাস্তি হবেই, এ বিষয়ে এনসিটিবি জিরো টলারেন্স।’
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘পিপিআর ২০২৫ অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর। একটি প্রেসকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।’ শাস্তি পাওয়া প্রেসগুলোর অন্য কোনো উপায়ে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এই প্রেসের যদি বেনামে আরও প্রেস থাকে, সেভাবে কাজ করতে পারে, তবে এই নামে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই।’ সাত প্রেসকে শাস্তি দিয়ে কী সব প্রেসের ‘ভালো’ কাজ নিশ্চিত করা সম্ভবÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা সময়ই বলবে, তবে এই পদক্ষেপের ফলে প্রেস সেক্টরে একটি বার্তা যাবে যে, অনিয়ম করে পার পাওয়া যাবে না। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।’ আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে বই ছাপার কাজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রেসের লাইসেন্স বাতিল করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান এনসিটিবির এই সদস্য।
এদিকে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান মনে করেন, কিছু চুনোপুঁটি প্রেসকে শাস্তি দিয়ে অনিয়ম দূর করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘এনসিটিবির কাজে সংশ্লিষ্ট প্রেস সীমিত। আমরা সবাই এসব প্রেস সম্পর্কে অবহিত। এনসিটিবিও জানে। তারপরও প্রেসগুলো কোন পরিদর্শনের ভিত্তিতে কাজ পায়, সেটাও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এনসিটিবিতে বই ছাপা নিয়ে আরও বেশি মাত্রায় অনিয়ম হয়। এসবের সঙ্গে জড়িত রাঘব বোয়ালদের রেহাই দিয়ে চুনোপুুঁটিদের শাস্তি দেওয়া হলেও তাতে কার্যকরভাবে অনিয়ম দূর করা সম্ভব নয়।’
২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সাড়ে ৮ কোটি বই ছাপার কাজ করেছে ৬৭টি প্রেস। অন্যদিকে মাদ্রাসার ইবতেদায়ি স্তরের প্রথম থেকে পঞ্চম ও ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির সাড়ে ২১ কোটি বই ছাপার কাজ করেছে ১০৩টি প্রেস। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পুরো বই ছাপার কাজ ৮১৪টি লটে ভাগ করে দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে লটপ্রতি সর্বনি¤œ দরদাতাকে ছাপার কাজ দেওয়ার সুপারিশ করে এনসিটিবির দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। এর আগে সংশ্লিষ্ট লটের বই ছাপার জন্য মনোনীত সর্বনি¤œ দরদাতার প্রেস কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে পারবে কি না, তা সরেজমিন পরিদর্শন করে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিকে প্রতিবেদন দেয় এনসিটিবির কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত মনিটরিং কমিটি বা প্রতিনিধিদল। পরে বই ছাপার কাজ শুরু হওয়ার পর এনসিটিবির মনিটরিং কমিটি প্রেসগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে কাজ সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কি না সে-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দেয়।
জানা গেছে, বই ছাপার কাজ নজরদারির জন্য এনসিটিবির কর্মকর্তাদের নিয়ে মাধ্যমিক স্তরে ৩৪টি ও প্রাথমিক স্তরে প্রায় সমপরিমাণ কমিটি গঠন করা হয়। দুই সদস্যবিশিষ্ট প্রতিটি কমিটি এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন (কাগজ, কালি ও ছাপা) অনুযায়ী বই ছাপছে কি না কিংবা কাজ পাওয়ার আগে এনসিটিবিতে জমা দেওয়া প্রেসের ভৌত অবকাঠামো তখনো কার্যকর কি না, প্রেসগুলো বই ছাপার কাজ ফেলে রেখে অন্য কিছু ছাপছে কি না ইত্যাদি নজরদারিসহ সার্বিকভাবে বই ছাপার জন্য প্রেসের পরিবেশ সহায়ক কি না, তা নজরদারি করে প্রতিবেদন জমা দেয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন