জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি সংস্কার বাস্তবায়ন ও বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত রাখবে জামায়াত জোট। জোটের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, জ্বালানি খাত নিয়ে চরম নৈরাজ্য চলছে। তাদের দাবি, একদিকে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন, অন্যদিকে লুটেরাদের ব্যাংক খাতে পুনর্বাসন চলছে। এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করতে মাঠে কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে জামায়াত জোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুতের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির প্রভাব আরও তীব্র করবে। এমন পরিস্থিতিতে সংসদের বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত জোটের প্রতিবাদী কর্মসূচি জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ও রাজনৈতিকভাবে যৌক্তিক বলে বিবেচিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মধ্যে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও ‘দুর্বিষহ’ করে দেবে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে গতকাল ঢাকাসহ দেশের সব মহানগরে বিক্ষোভ কর্মসূচি করেছে জামায়াতে ইসলামী। বর্ধিত দাম প্রত্যাহারের এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছে দলটি। জামায়াত জোটের অন্যতম শরিক এবি পার্টি জানায়, জনগণের পকেট কাটতেই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে কোনো ধরনের দখল বা নিয়ন্ত্রণের পাঁয়তারা দেশের জনগণ মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। প্রয়োজনে বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারিও দেন বিরোধীদলীয় প্রধান।
জোটের শরিক দলগুলো বলছে, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মধ্যে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও ‘দুর্বিষহ’ করে তুলবে। নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, সাধারণ গ্রাহকের খরচ বাড়ছে ১৬.৭ শতাংশ। পাইকারি বিদ্যুতের ভারিত গড় মূল্য ইউনিটপ্রতি ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩১ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩১ পয়সা করা হয়েছে। এতে পাইকারি পর্যায়ে দাম বেড়েছে ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ।
সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ ইউনিটপ্রতি ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা করা হয়েছে। এতে সঞ্চালন চার্জ বেড়েছে ২৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। আর খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন গ্রাহকশ্রেণির বিদ্যুতের ভারিত গড় মূল্য ইউনিটপ্রতি ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে খুচরা পর্যায়ে গড় দাম বেড়েছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় জামায়াতের অবস্থান তুলে ধরে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এর ফলে গার্মেন্টস খাত, কৃষি, সেচ, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও পরিবহনসহ জনজীবনের সব ক্ষেত্রে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী চলতি বছরের শুরুতে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে না, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি তিন মাসও রক্ষা করা হয়নি। এদিকে দেশে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম কয়েকশ টাকা বাড়ানোর পর আবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষ, যারা স্বল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। ব্যাংকিং খাত নিয়ে বলেন, ব্যাংকের গ্রাহকরা ব্যাংক রক্ষার দাবিতে আন্দোলন করলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়, অথচ দুর্নীতিবাজ ঋণখেলাপিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। দেশের ইসলামী ব্যাংক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং এশিয়ার বৃহৎ ব্যাংকগুলোর একটি। অতীতে একটি গোষ্ঠী ব্যাংকটি লুটপাট করেছে এবং বর্তমানে নতুন করে একই ধরনের অপচেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, জনগণের বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় বা অবিচার সহ্য করা হবে না। প্রয়োজন হলে রাজপথে কঠোর কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া হবে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, দেশের জনগণ যখন লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেকারত্ব, শিল্প খাতের সংকট এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে দিশাহারা, তখন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর নতুন অর্থনৈতিক নির্যাতন চাপিয়ে দেওয়ার শামিল। তিনি বলেন, জনগণের ঘাড়ে বারবার মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, লুটপাট ও নীতিগত ব্যর্থতার দায় এড়ানো সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ভুল পরিকল্পনা, অস্বচ্ছ চুক্তি, অতিরিক্ত সক্ষমতার নামে জনগণের অর্থ অপচয় এবং জবাবদিহিতার অভাবে বিদ্যুৎ খাতকে সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এখন সেই ব্যর্থতার মূল্য সাধারণ জনগণকে দিতে বাধ্য করা হচ্ছে; যা কোনোভাবে মেনে নেওয়া হবে না।
জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, বিদ্যুতের মূল্য ইস্যুতে তারা কর্মসূচি দিতে পারেন। একই সঙ্গে নানা খাতে চলমান ‘অর্থনৈতিক দুরবস্থার’ মধ্যে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধিকে সরকারের ‘স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যায়িত করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, বাজেটের আগে তড়িঘড়ি করে আবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছাচারী। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিতে এমনিতেই যখন সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস দেখা দিয়েছে, তখন বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে দেবে।

