মারধরের মামলায় সাক্ষী হওয়ায় খুন হতে হয় ওয়ার্ল্ড ইউনিভাসির্টির মেধাবী শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন মাহিরকে। আর এ হত্যাকা-ের নেতৃত্বে ছিলেন মাহিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা। ডেকে নিয়ে রাতভর ভয়াবহ নির্যাতন করে পিটিয়ে হত্যা করে মাহিরকে। এ ঘটনায় পুলিশ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করলেও মূল হত্যাকারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে গেছে। অভিযোগ উঠেছে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী রাকিবুল ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে বাদীর পরিবারকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে।
গত ২৯ মে রাজধানীর উত্তরা থেকে ওয়ার্ল্ড ইউনিভারসিটির শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন মাহির নিখোঁজ হয়। এ ঘটনায় মাহিবের বোন প্রথামে থানায় একটি নিখোঁজ ডায়রি করে। পরে ২ মে একটি মামলা করেন। ৫ মে হবিগঞ্জের এক জঙ্গল থেকে মাহিরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যাকা-ের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে আরাফাত, মৃদুল সরকার ও জাহিদ মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে আরাফাত আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। তবে হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী রাবিবুল ইসলামসহ অন্যরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
পুলিশের তদন্ত সংশ্লিস্টরা বলছেন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন মাহির (২৩) পূর্বপরিকল্পিতভাবে অপহরণ ও হত্যাকা-ের শিকার হন। মাহিরের বন্ধুদের সহায়তায় এই হত্যাকা- সংঘটিত হয়। গত মে মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। পূর্ব বিরোধের প্রতিশোধ নিতে রাকিবুল মাহিরকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৩০ এপ্রিল রাতে বন্ধু ইয়াসিনের মাধ্যমে মাহিরকে কৌশলে উত্তরার বোনের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে রাজধানীর বাড্ডার আফতাবনগরের একটি বাসায় আটকে রাখা হয়। রাতভর দফায় দফায় শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে মাহিরকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ বস্তাবন্দি করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে হবিগঞ্জের মাধবপুরের জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়। মাহির বাসায় না ফেরায় পরিবারের পক্ষ থেকে বাড্ডা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরে পুলিশ মৃদুল সরকার নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৫ মে হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে মাহিরের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মাহিরের বোন বাদী হয়ে ২ মে বাড্ডা থানায় মামলা দায়ের করেন।
পুলিশের তদন্ত সংশ্লিরা জানিয়েছে, চার বোন আর তিন ভাইয়ের মধ্যে ফরহাদ হোসেন মাহির ছিল সবার ছোট ছিল। পরিবারের আদরের সন্তান মাহিনর পড়াশোনা করতেন উত্তরার ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিতে। মোবাইল কেনার কথা বলে গত ২৯ এপ্রিল মাহিরকে উত্তরার বোনের বাসা থেকে ডেকে নেন বন্ধু ইয়াসিন আরাফাত। মাহিরকে বাড্ডার আফতাবনগর এলাকার একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রুমে আটকে রেখে কয়েকজন রাত ৮টা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত কয়েক দফা পিটিয়ে মাহিরকে হত্যা করে। ঘটনায় মাহিরের বন্ধু আরাফাত পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছে এবং আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। মূলত আরাফাতের জবানবন্দিতে হত্যকা-ের কারণ, পরিকল্পনা এবং জড়িতদের নাম উঠে আসে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছে, এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জবানবন্দি দেওয়া আরাফাতের তথ্যে উঠে এসেছে, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মাহিরকে ডেকে নেওয়ার পর এমনভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল যে, শেষবার পানিও দেওয়া হয়নি। নির্মম মারধরে মাহিরের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তার লাশ গুম করতে হবিগঞ্জে নিয়ে যাওয়া যায় একটি গাড়িতে। পরে জঙ্গলের মধ্যে মরদেহ ফেলে আসে খুনিরা। পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় করা মামলায় মাহিরের বন্ধু ইয়াসিন আরাফাত, আরাফাতের বন্ধু রাকিবুল ইসলাম, রাকিবুলের স্ত্রী মোছা. অনন্যা, সহযোগী তানভীর হোসেনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়। মামলার পর পুলিশ ইয়াসিন আরাফাত, মৃদুল সরকার ও গাড়িচালক জাহিদ মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে আরাফাত আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাড্ডা থানার এসআই হানিফ জানান, ঘটনার রাতে মাহির বাসায় না ফেরায় উত্তরখান থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বাদী জানতে পারেন আরাফাত, রাকিবুল, তানভীর, অনন্যাসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা পূর্ব শত্রুতার জেরে মাহিরকে আফতাবনগরে নিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে। পরে এ ঘটনায় একটি মামলা হয়। মামলার সূত্র ধরে ইয়াছিন আরফাত, মৃদুল সরকার এবং যে গাড়িতে করে রাকিবের মরদেহ গুম করা হয়েছে সেই গাড়ির চালক জাহিদ মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসআই মো. হানিফ বলেন, ‘মামলার তদন্ত চলছে। অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছে। তারা ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করছে। ফলে তাদের গ্রেপ্তারে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
মামলার তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী রাকিবুল প্রথম স্ত্রীর নাম সীমা। সীমাকে বিয়ে করার পর নানা কারণে মারধর করতেন রাকিব। এ কারণে রাকিবের বিরুদ্ধে তার স্ত্রী সীমা মামলা করে। সেই মামলায় সাক্ষী হয় মাহির। আর এ ক্ষোভ থেকেই মাহিরকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন রাকিব। বন্ধু ইয়াসির আরাফাতসহ আসামিদের সহযোগিতায় মাহিরকে হত্যা করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে আরাফাত পুলিশকে বলেছেন, রাকিব ও সীমার মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। রাকিব সীমাকে মারধর করছেনÑ এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখতেন মাহির। একপর্যায়ে সীমা বাসা থেকে বের হয়ে গিয়ে রাকিবুলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেন সীমা। বাদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেন মাহির। বন্ধুর অনুরোধে আরাফাতও সীমার পক্ষে সাক্ষ্য দেন। পরে রাকিবুল মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে আরাফাত সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাকিবুল বলেন, তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ায় আরাফাত ফেঁসে গেছেন, বাঁচতে হলে সহযোগিতা করতে হবে।

