বাংলাদেশে প্রতিবছরই জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, দেশে বর্তমানে প্রায় তিন লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত, যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে মৃত্যুর হারও বেড়েছে প্রায় আট শতাংশ। বর্তমানে প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে ভুগে এক লাখ ১৬ হাজার ৫০০-এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন এবং নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন আরও এক লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি মানুষ। চিকিৎসকদের মতে, মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এই হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি, কারণ একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হন না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে খাদ্যনালির ক্যান্সারে। প্রতিবছর নতুন আক্রান্তদের ১৫ শতাংশের বেশি এই ক্যানসারের শিকার হচ্ছেন, যার মধ্যে পুরুষের সংখ্যা বেশি। এই রোগে বছরে প্রায় ২৪ হাজার মানুষ মারা যান, যা দেশে ক্যানসারে মোট মৃত্যুর প্রায় ২০ শতাংশ। আক্রান্তের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসার। জর্দাসহ তামাক সেবনের কারণে প্রতিবছর ১৬ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রায় সাড়ে ৯ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একটি বড় অংশই মুখ ও ঠোঁটের ক্যানসারে আক্রান্ত। এর পরেই রয়েছে ফুসফুসের ক্যানসার, যাতে আক্রান্ত হয়ে বছরে ১২ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে এই ক্যানসারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি, যার প্রধান কারণ ধূমপান ও তীব্র বায়ুদূষণ।
অন্যদিকে, নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্ষেত্রে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ক্যানসার আক্রান্ত নারীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশের বেশি স্তন ক্যানসারে ভুগছেন। প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার নারী নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ছয় হাজারেরও বেশি নারী মারা যাচ্ছেন। একইভাবে, প্রজনন স্বাস্থ্যজনিত ক্যানসারের মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসার নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে দেশে সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত এবং প্রতিবছর প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি নারী এই কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের নারীরা অনেক কম বয়সে, বিশেষ করে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যেই স্তন ও জরায়ুর ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
দেশে এভাবে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার পেছনে মূলত পরিবেশদূষণ এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, দেশের বাতাসের বিপজ্জনক মাত্রার বায়ুদূষণ সরাসরি ফুসফুসের ক্যানসার বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল, অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান এবং জর্দা বা তামাকপাতা সেবনের কারণে খাদ্যনালি ও মুখের ক্যানসার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তবে স্তন ও জরায়ুমুখের মতো ক্যানসারগুলো সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় টিকাদানের মাধ্যমে অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে বর্তমানে ক্যানসার প্রতিরোধী টিকার যে কার্যক্রম চলছে, তার আওতা বা কাভারেজ দ্রুত বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে পারলে ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন