ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্প

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৩০ এখনো নিখোঁজ ৫১ হাজার

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬, ০৬:২১ এএম

লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের কয়েক দিন পরও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। দেশটির সরকারি হিসাবে এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৩০ জনে। একই সঙ্গে প্রায় ৫১ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। এদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কায় অব্যাহত রয়েছে উদ্ধার অভিযান। কিন্তু ভারী যন্ত্রপাতির অভাব, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে সেই কাজও বিঘিœত হচ্ছে।

গত বুধবার রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প দেশটির উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় লা গুয়াইরা অঞ্চল এবং রাজধানী কারাকাসের কয়েকটি এলাকা। শক্তিশালী ওই ভূমিকম্পের পর থেকে শত শত অণুকম্পন অনুভূত হয়েছে। এতে আতঙ্ক কাটছে না সাধারণ মানুষের। এর মধ্যে গত শনিবার বিকেলে আরাগুয়া উপকূলে ৪ দশমিক ৮ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। অবশ্য এ কারণে নতুন করে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

উদ্ধারকারীরা জানান, ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা জীবিত মানুষ উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেই সময়সীমা অতিক্রম করায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকাপড়া ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবুও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা নিরলসভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধার তৎপরতা।

সরকারি সূত্রে কয়েকশ মানুষ নিখোঁজের তথ্য দেওয়া হলেও বিরোধীপক্ষের তথ্যে নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। বহু এলাকায় মোবাইল ফোন যোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন থাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় এক হাজার ৬০০ বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকর্মী এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছেন। তারা ধসেপড়া বহুতল ভবন, আবাসিক এলাকা, বিপণিবিতান এবং অন্যান্য স্থাপনায় আটকেপড়া মানুষদের উদ্ধারে স্থানীয় দলগুলোর সঙ্গে কাজ করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি উদ্ধার তৎপরতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ধীর। বহু স্থানে এখনো পর্যাপ্ত উদ্ধারকারী দল কিংবা ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছেনি। ফলে স্বজনদের উদ্ধারে ধ্বংসস্তূপ সরানোর যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

কারাকাসের এক বাসিন্দা জানান, সরকার নয়, সাধারণ মানুষই একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছে। অন্যদিকে লা গুয়াইরাসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা দ্রুত ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন।

ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে স্বজনদের অপেক্ষায় থাকা মানুষের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। নিখোঁজ বোনের খোঁজে ছুটে বেড়ানো এক প্রকৌশলী জানান, তিনি হাসপাতাল থেকে উদ্ধারকারী দলÑ সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছেন; কিন্তু এখনো তার বোনের কোনো সন্ধান পাননি। তার একমাত্র প্রার্থনা, বোন যেন জীবিত অবস্থায় ফিরে আসে।

ভয়াবহ এই দুর্যোগে দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের উপচেপড়া ভিড়। চিকিৎসক ও নার্সরা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে দিনরাত কাজ করলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও শয্যার সংকট দেখা দিয়েছে।

মর্মস্পর্শী এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, এই দুর্যোগে প্রায় ১৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার শিশুর জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। ঘরবাড়ি, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় হাজারো পরিবার নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

সংস্থাটি এরই মধ্যে জরুরি সহায়তাবাহী বিমান পাঠিয়েছে। এসব সহায়তার মধ্যে রয়েছেÑ জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের উপকরণ, অস্থায়ী আশ্রয়ের তাঁবু এবং অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আরও সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ।

জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই ভূমিকম্পে সরাসরি আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৭ থেকে ৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো পুনর্গঠন, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত পুনর্বাসনে দীর্ঘ সময় এবং বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে।

এদিকে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ আটকে থাকায় শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন ভেনেজুয়েলা। উদ্ধার অভিযান, মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের গতি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করছে হাজারো মানুষের জীবন এবং বিপর্যস্ত জনগণের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা।