জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাসুদ রানাকে ঘিরে দুর্নীতি, ঘুষ, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের হয়রানির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগে তোলপাড় চলছে সংশ্লিষ্ট মহলে। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও কীভাবে তিনি ও তার পরিবার রাজধানীসহ দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিক হলেনÑ এ প্রশ্ন এখন বিএমইটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে দাখিল করা এক লিখিত অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারী মো. মন্টু মিয়ার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং জনশক্তি খাতের বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে মাসুদ রানা অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রশাসন শাখার দায়িত্বে থাকলেও বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশগামী শ্রমিকদের ফাইল, ছাড়পত্র ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হতো। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের বিদেশযাত্রার বিভিন্ন ধাপে অঘোষিত আর্থিক লেনদেন ছাড়া অনেক কাজ এগোতো না।
বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও জনশক্তি রপ্তানি খাত নিয়ে বিভিন্ন সময় অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএমইটির ভেতরে অসাধু কর্মকর্তা ও রিক্রুটিং এজেন্সির যোগসাজশে নানা অনিয়মের অভিযোগ গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (টিটিসি) অধ্যক্ষ ও কর্মকর্তাদের ঢাকায় ডেকে বৈঠক করতেন মো. মাসুদ রানা। এসব বৈঠকের পর প্রশাসনিক পদায়ন ও বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো বলে অভিযোগকারীর দাবি। সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, কাক্সিক্ষত পদায়ন ও বদলির জন্য অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতায় তিনি পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ করেন এবং পরবর্তীতে সেই অবস্থান ব্যবহার করে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন।
অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্যমতে, মো. মাসুদ রানা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, নিকেতন ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া উত্তরা এলাকায় দুটি বাড়ি, সাভারে কয়েক বিঘা জমি এবং নিজ জেলা নেত্রকোনায় বিলাসবহুল বাড়ি ও বিপুল পরিমাণ ভূ-সম্পদের তথ্য অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এসব সম্পদের বড় অংশই তার পরিচিত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং প্রকৃত মালিকানা যাচাই করলে আরও বিস্তৃত সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা রয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় ‘মাই সেকেন্ড হোম’ সুবিধা গ্রহণ, দুবাইয়ে জনশক্তি ব্যবসায় বিনিয়োগ, ভিলা মালিকানা এবং স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা এসব সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করলে অবৈধ অর্থ উপার্জনের নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হতে পারে।
বিএমইটির অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হলেও তিনি অনেক ক্ষেত্রে মহাপরিচালকের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতেন। নতুন কোনো মহাপরিচালক দায়িত্ব নিলেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার প্রভাব বজায় থাকত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ কারণেই অনেক কর্মকর্তা তাকে প্রতিষ্ঠানটির ‘অঘোষিত ডিজি’ হিসেবে অভিহিত করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হলে মো. মাসুদ রানার নামে-বেনামে থাকা সম্পদের প্রকৃত হিসাব বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে ঘুষ, দুর্নীতি, বদলি বাণিজ্য, বিদেশগামী শ্রমিকদের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগেরও সত্যতা যাচাই সম্ভব হবে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. মাসুদ রানার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এদিকে অভিযোগকারীরা বলছেন, বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সুষ্ঠু তদন্ত হলে অভিযোগের সত্যতা এবং সম্পদের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট চিত্র উঠে আসবে।
জানতে চাইলে তার ব্যক্তিগত (পিএস) জাহাঙ্গীর রূপালী বাংলাদেশকে জানান, বিএমইটি পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাসুদ রানার বিষয়টি তো সমাধান হয়ে গেছে। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে মিটমাট করে নিয়েছেন। এটা তো আর নিউজ হওয়ার দরকার নেই। দরকার হলে আপনি আসেন। অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে যেমন মিটমাট হয়েছে দরকার হলে আপনার সঙ্গেও স্যারের মিটমাট করিয়ে দিব। আপাতত নিউজ কইরেন না। তবে স্যার অন্য জায়গায় বদলি হয়ে যাচ্ছে। অন্য জায়গা বলতে কোথায় বদলি হচ্ছেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের অফিসেই হয়তো অন্য শাখায় যাবেন। এ বিষয়ে মো. মাসুদ রানা স্যার আমাকে জানিয়েছেন, তিনি আপাতত এসব বিষয়ে কথা বলতে চান না।
এসব বিষয়ে দুর্নীতির বিষয়ে সমালোচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেছেন, যারা দুর্নীতি করছে বা করার চিন্তা করছে তাদের বিরুদ্ধে সরকারের শক্তিশালী আইনগত ও শান্তিযোগ্য ভূমিকা নেওয়া উচিত। সেটা না হলে এই দেশ থেকে দুর্নীতি মুক্ত করা সম্ভব হবে না।

