চায়ের দেশ সিলেটে ভয়ানক স্বাস্থ্য বিপর্যয় হিসেবে নিঃশব্দে হানা দিচ্ছে ‘ফ্যাটি লিভার’। তথ্য বলছে, দেশের প্রতি তিনজনে একজন লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার এই নীরব ঘাতকের শিকার। সিলেটের চিত্রটি আরও বেশি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে আধুনিক নগরায়ণ, প্রবাসী পরিবারগুলোর কায়িক পরিশ্রমহীন জীবনযাপন, ফাস্ট ফুড এবং অতিরিক্ত ডিভাইস আসক্তির করালগ্রাসে সিলেট। এখানকার প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ স্কুলগামী শিশু এখন এই রোগের মারাত্মক ঝুঁকিতে। চিকিৎসকদের মতে, অলক্ষে থাকা গ্রেড-১ বা প্রাথমিক স্তরের ফ্যাটি লিভার কোনো বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ করে না বলেই এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। সঠিক সময়ে খাদ্যাভ্যাসের শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক পরিশ্রম ফিরিয়ে না আনলে, এই কোমলমতি শিশুরা ৩০ বা ৪০ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগে লিভার সিরোসিস বা ক্যান্সারের মতো অকাল ও নিরাময়-অযোগ্য পরিণতির দিকে ধাবিত হবে। আর এমনই চরম সতর্কবার্তা উঠে এসেছে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক চিকিৎসা সমীক্ষায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও হেপাটোলজি সোসাইটির সাম্প্রতিক জাতীয় তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ দশমিক ৮৬ শতাংশÑ অর্থাৎ প্রতি ৩ জনে ১ জন মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। জাতীয় এই বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির বাইরে নেই সিলেটও। বিষয়টি স্থানীয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। চিকিৎসকদের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেট বিভাগে লিভারের গুরুতর বা ক্রনিক লিভার ডিজিজের হার তুলনামূলক কমÑ অর্থাৎ ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে আধুনিক নগরায়ণ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে ফ্যাটি লিভারের প্রাথমিক ও মাঝারি স্তরের প্রকোপ এখানে প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
শহরের শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিলেট শহরের তিনটি সুপরিচিত বেসরকারি ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত একটি বিশেষ আল্ট্রাসনোগ্রাফি স্ক্রিনিং ও স্বাস্থ্য সমীক্ষায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। যেখানে দেখা যায় শহরের প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া শিশু ইতিমধ্যে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের এই আক্রান্ত হওয়ার পেছনে সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে আধুনিক শহুরে ক্ষতিকর জীবনযাত্রার। যেসব শিশু নিয়মিত ফাস্ট ফুড, কোমল পানীয়, চিপস ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে অভ্যস্ত, তাদের লিভারে দ্রুত চর্বি জমছে। একই সঙ্গে মাঠে গিয়ে খেলাধুলা বা কায়িক পরিশ্রম না করে দিনে দীর্ঘ সময় কম্পিউটার, মোবাইল বা ভিডিও গেমের স্ক্রিনের সামনে কাটানো শিশুদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ শিশুদের তুলনায় প্রায় দুই গুণ বেশি। আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ চিকিৎসাগতভাবে অতিরিক্ত ওজনের শিকার।
সিলেটে ফ্যাটি লিভারের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলেছেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি (লিভার) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. মোতাহের হোসেন। হাসপাতালে আসা লিভার রোগীদের বড় অংশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, অনেকে দীর্ঘদিন ধরে অজান্তে ফ্যাটি লিভারে ভুগছিলেন। এ রোগের অন্যতম বড় সংকট হলো এর ‘লক্ষণহীনতা’। প্রাথমিক বা গ্রেড-১ স্তরে সাধারণত কোনো বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ পায় না বলে রোগীরা বুঝতেই পারেন না যে তাদের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ডা. মো. মোতাহের হোসেন বলেন, আমাদের সমাজে একটি বড় ভুল ধারণা আছে যে, চর্বিযুক্ত খাবার বা অ্যালকোহল না খেলে লিভারে চর্বি জমে না। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, আমাদের খাদ্যাভ্যাসে থাকা অতিরিক্ত শর্করা। প্রতিদিন আমরা যে অতিরিক্ত ভাত, ময়দা, মিষ্টি ও কোমল পানীয় গ্রহণ করি, তা-ই লিভারে গিয়ে চর্বি বা ফ্যাট হিসেবে জমা হয়। বিশেষ করে সিলেটের অনেক প্রবাসী পরিবারের জীবনযাত্রায় কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং রিচ-ফুড অর্থাৎ তৈলাক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বেশি, যা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হয়, তবে ৩০ বা ৪০ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগে তারা লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন না আনলে এই সাধারণ ফ্যাটি লিভারই পরবর্তীতে ‘নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটোহেপাটাইটিস’ এবং সেখান থেকে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ও নিরাময়-অযোগ্য জটিলতায় রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যারা ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, তাদের লিভার দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেখানে ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব ৭১ শতাংশ এবং উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে তা ৬৩ শতাংশ।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সিলেটের চিকিৎসকেরা এই নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচতে শিশুদের ফাস্ট ফুড ও অতিরিক্ত ডিভাইস আসক্তি থেকে দূরে রাখার তাগিদ দিয়েছেন। সিলেটের প্রখ্যাত চিকিৎসক, নিউরোলজির প্রফেসর ডা. মুনিম সাজু বলেন, কোনো ওষুধ ছাড়া শুধু জীবনযাত্রায় তিনটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারলে এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। প্রথমত, কায়িক পরিশ্রম বাড়াতে হবে, যার জন্য দৈনিক অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো বা সাইকেল চালানো উচিত। শিশুদের জন্য মাঠে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, খাবারে নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি। যেখানে দুপুরের বা রাতের খাবারের থালা থেকে অতিরিক্ত শর্করা যেমন ভাত, রুটি ও ময়দা এবং চিনি ও মিষ্টি কমিয়ে শাকসবজি, ফলমূল ও সামুদ্রিক মাছের পরিমাণ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শরীরের বর্তমান ওজনের অন্তত ৫ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস করতে হবে। তিনি বলেন, বিজ্ঞানীরা এ প্রসঙ্গে একটি স্লোগান দিয়েছেন, ‘কম খাই হাঁটি বেশি, ফ্যাটি লিভার দূরে রাখি।’ এই বার্তা যদি এখনই সিলেটে প্রতিটি পরিবারে বাস্তবায়ন করা না যায়, তবে আগামী প্রজন্ম এক বড় স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

