ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই, ২০২৬

ভারত ভ্রমণ শেষে ব্রিটিশ তরুণীর মস্তিষ্কে মিলল ৩৮ পরজীবী

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৬, ২০২৬, ০৬:২১ এএম

যুক্তরাজ্যের কারমার্থেনের বাসিন্দা লোরি ডেনম্যান ২০০৭ সালে তিন মাসের জন্য ভারত ভ্রমণে এসেছিলেন। মাংস খেয়ে ফুড পয়জনিং এড়াতে পুরো সফরে তিনি নিরামিষ খেয়েছেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে সেখানেই তিনি এক মারাত্মক সংক্রমণের শিকার হন, যা তার জীবনকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দেয়। চিকিৎসকদের ধারণা, অসাবধানবশত খাবারের মাধ্যমে শূকরের ফিতাকৃমির আণুবীক্ষণিক ডিম লোরির শরীরে প্রবেশ করে। তবে এর লক্ষণ প্রকাশ পেতে সময় লেগেছিল প্রায় তিন বছর। ২০১০ সালে হঠাৎ করেই টয়লেটে এক মিটার লম্বা একটি ফিতাকৃমি আবিষ্কার করেন লোরি। শুরুতে সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সবকিছু স্বাভাবিক এলেও এর পরের বছর থেকেই শুরু হয় তীব্র মাথাব্যথা এবং মৃগীরোগীর মতো আকস্মিক খিঁচুনি।

এরপর হাসপাতালে সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই করার পর চিকিৎসকরা লোরির মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবীর উপস্থিতি শনাক্ত করেন। এটি ছিল অত্যন্ত বিরল এক রোগ, যার নাম ‘নিউরোসিস্টাইসারকোসিস’। শূকরের ফিতাকৃমির লার্ভা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়লে এই ইনফেকশন হয়, যা যুক্তরাজ্যে সাধারণত দেখাই যায় না। রোগ ধরা পড়ার পর লোরিকে অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধ ও স্টেরয়েড দেওয়া হয়। চিকিৎসার পর কয়েক বছর সুস্থ ছিলেন তিনি। কিন্তু ২০১৫ সালে অফিসে আচমকা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাওয়ার পর তার পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। মস্তিষ্কে থাকা পরজীবীগুলোর চারপাশে তীব্র প্রদাহ ও ফোলাভাব তৈরি হয়, এতে তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে।

এই সংক্রমণের ফলে লোরি তীব্র প্যারানয়া, প্যানিক অ্যাটাক এবং সাইকোসিসের শিকার হন। পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নেয় যে, তাকে ছয় সপ্তাহের জন্য একটি নিউরোসাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে কাটাতে হয়। সেই সময়ে তার আচরণ এতটাই বদলে গিয়েছিল যে, দীর্ঘদিনের বন্ধুরাও তাকে চিনতে পারছিলেন না। তার এক বন্ধু জানান, হাসপাতালে লোরি অবুঝ শিশুর মতো আচরণ করতেন এবং বিভ্রমের কারণে অদ্ভুত সব বার্তা পাঠাতেন। লোরির পরিবার ও বন্ধুরা তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা নিয়ে পুরোপুরি আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।

তবে দীর্ঘ ও মানসিক লড়াইয়ের পর লোরি আবার সুস্থ জীবনে ফিরতে শুরু করেন। ২০১৭ সালের পর তার আর কোনো খিঁচুনি হয়নি। বর্তমানে তার মস্তিষ্কের সেই ৩৮টি পরজীবী ওষুধের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় হয়ে ক্যালসিয়ামে রূপান্তরিত (ক্যালসিফাইড) হয়ে গেছে, অর্থাৎ সেগুলো এখন মৃত। লোরির সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. ব্রেন্ডন হিলি জানান, চিকিৎসাজীবনে এটি তার দেখা একমাত্র এবং সবচেয়ে জটিল ও বিরল ঘটনা, যা নিয়ে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করেছেন। দীর্ঘ লড়াই শেষে লোরি এখন সুস্থ, কার্ডিফে চাকরি করছেন এবং নিজের এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচক রূপ দিতে এই বিরল রোগ সম্পর্কে বিশ^জুড়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন।