ঢাকা রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

নিরাপত্তাঝুঁকিতে আশ্রয় কেন্দ্রের নারী ও শিশুরা

সাইফ বাবলু
প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ০৬:২৬ এএম

উজানের ঢল ও টানা বর্ষণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্লাবিত জনপদ ছেড়ে হাজারো মানুষ আশ্রয় নিচ্ছেন স্কুল, কলেজ ও সাইক্লোন শেল্টারসহ বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু নিরাপত্তার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া নারী ও শিশুদের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে নারী-পুরুষের মিশ্র অবস্থান, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় যৌন হয়রানি, কটূক্তি ও নির্যাতনের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। যদিও পুলিশ বলছে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার বন্যা পরিস্থিতিতে আশ্রয়কেন্দ্র অথবা পানিবন্দি কোনো পরিবারে নারী ও শিশুরা যাতে যৌন নিপিড়ন, ধর্ষণ বা অন্য কোনো ঝুঁকিতে না পড়ে, সে জন্য পুলিশকে সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত বছর দেশের বেশ কিছু জেলায় বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে প্লাবিত হয়ে লাখ লাখ মানুষ বিপর্যয়ে পড়ে। ওই সময় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও বন্যাকবলিত এলাকায় অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে পুলিশ বাহিনীও কাজ করে। বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তারা জানতে পারে, ওই বন্যা পরিস্থিতিতে অনেক নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ এবং নানাভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। যেসব সময়ে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেই সময়ে অভিযোগ জানানোর মতো কোনো পরিস্থিতি ছিল না। এবার বন্যায়ও একই ধরনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরাবনসহ দেশের অনেক উপকূলীয় জেলায় বন্যা পরিস্থিতি চলমান রয়েছে। এসব এলাকায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, আনসার সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতকারী এই সুযোগে নারী ও কন্যাশিশুদের যৌন হয়রানি করছে বলেও অভিযোগ এসেছে।

পুলিশ স্টাফ কলেজের গবেষণায় বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানকারী নারী ও শিশুদের বড় একটি অংশ যৌন হয়রানি, কটূক্তি কিংবা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া উত্তরদাতাদের তথ্য অনুযায়ী, আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানকালীন ৭৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ নারী ও শিশু কোনো না কোনো ধরনের যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। গবেষণাটি গত বছর উপকূলীয় অঞ্চলের ৩৮৫ জন বাসিন্দার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এতে দুর্যোগকালীন অপরাধের ধরন, ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, দুর্যোগকালে সংঘটিত অপরাধের সবচেয়ে বেশি শিকার হন নারীরা। মোট ভুক্তভোগীর ৫১ দশমিক ২৩ শতাংশ নারী, ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশ শিশু এবং ১৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবীণ। পুরুষ ভুক্তভোগীর হার মাত্র ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ।

গবেষণায় অংশ নেওয়া একাধিক নারী জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে রাতের বেলায় কটূক্তি, শরীরে অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শ, ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা অভিযোগ করেন না। কারণ অভিযোগ করলে সামাজিকভাবে হেনস্তা হওয়ার আশঙ্কা থাকে, আবার অনেক সময় অভিযোগ গ্রহণের মতো কার্যকর ব্যবস্থাও থাকে না। গবেষণায় উঠে এসেছে, দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ তুলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। দুর্যোগের সময় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংকট তৈরি হলে এমন অভিযোগের প্রবণতা বাড়ে, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত অপরাধের চেয়ে গুজব বা সন্দেহের ওপর নির্ভরশীল।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়। অংশগ্রহণকারীদের ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ জানিয়েছেন, দুর্যোগকালীন তারা আশ্রয়কেন্দ্র বা আশপাশে পুলিশের উপস্থিতি দেখেননি। অন্যদিকে যারা পুলিশের উপস্থিতি দেখেছেন, তাদের প্রায় অর্ধেকের মতে, পুলিশ মূলত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কিংবা সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত ছিল। ফলে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ছোট ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ অনেক সময় নজরের বাইরে থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আশ্রয়কেন্দ্রকে কেবল দুর্যোগ থেকে প্রাণরক্ষার স্থান হিসেবে দেখলে হবে না; এটিকে নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্রে নারী, পুরুষ ও শিশুদের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা নেই। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত আলো, নিরাপদ টয়লেট, নারী স্বেচ্ছাসেবক কিংবা অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ে।

পুলিশ স্টাফ কলেজের পরিচালক (গবেষণা ও প্রকাশনা) মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, দুর্যোগের সময় মানুষ জীবন বাঁচাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যায়। কিন্তু সেখানে যদি নারী ও শিশু নিরাপদ না থাকে, তাহলে পুরো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, একই কক্ষে নারী, শিশু ও পুরুষের অবস্থান এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব থেকেই বেশির ভাগ যৌন হয়রানি ও কটূক্তির ঘটনা ঘটে। তার মতে, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারী, পুরুষ ও শিশুদের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে তা সম্ভব নয়, সেখানে অন্তত পৃথক ফ্লোর বা নির্দিষ্ট নিরাপদ অংশ রাখতে হবে। পাশাপাশি নারী পুলিশ, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তা সেবা চালু করা প্রয়োজন। এতে ভুক্তভোগীরা দ্রুত সহায়তা পাবেন এবং অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকিও কমবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের ঘনত্ব বাড়ছে। ফলে প্রতি বছরই বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং লিঙ্গ সংবেদনশীল পরিকল্পনা সেই হারে এগোয়নি। ফলে একই ধরনের ঝুঁকি বারবার ফিরে আসছে।

তাদের মতে, প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ও শিশু সুরক্ষা পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং কমিউনিটি পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর গোপন ও সহজ ব্যবস্থা চালু করলে অনেক ভুক্তভোগী সামনে আসতে পারবেন।

দুর্যোগের সময় মানুষের প্রথম প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সেই আশ্রয়ই যদি নারী ও শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তাহলে দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপূর্ণ থেকে যাবে। তাই আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলোকে নারী ও শিশুবান্ধব ও নিরাপদ করে তোলার বিষয়টিকে এখনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এইচ এম সাহাদাত হোসাইন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, গেল বছর দেশে বন্যা ও দুর্গোযপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র অথবা পানিবন্দি থাকা পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে এ ধরনের চিত্র পায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার বন্যা পরিস্থিতিতে আশ্রয়কেন্দ্র ও পানিবন্দি এলাকায় যারা এখনো বাসা-বাড়িতে আটকে আছে, সেই সব এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দুর্গত এলাকায় পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো এবং প্লাবিত এলাকাগুলোতে যেসব নারী শিশু আটকে আছে, সেখানে সতর্ক থাকার জন্য, যাতে কোনো ধরনের নিপীড়নের ঘটনা না ঘটে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, সারা বছরই আমাদের দেশে নারী ও শিশুরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। বন্যা পরিস্থিতিতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। কারণ একসঙ্গে সব এলাকায় পুলিশের সব সময় নজরদারি রাখা সম্ভব হচ্ছে না। জরুরি সেবায় ফোন দিলে পুলিশ অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দুর্গত এলাকায় নারী ও শিশুদের নিরপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করতে পারবে।