ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

এইচআরএসএসের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন

 মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত ১৩৩

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৬:২৫ এএম

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটির অর্ধবার্ষিক (জানুয়ারি-জুন ২০২৬) পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক নির্যাতন, শ্রমিক নির্যাতন এবং সীমান্তে হতাহতের মতো নানা উদ্বেগজনক চিত্র।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে গত ছয় মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৬১টি ঘটনায় অন্তত ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাগি¦ত-া, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সারা দেশে এসব গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটে। দেশের মূলধারার ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে ছয় মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য সংকলন করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এ ছাড়া এই সময়ে রাজনৈতিক সংঘাতে ৮৩০টি ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫৬ জন নিহত এবং ৫২৪৬ জনের অধিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন। নিহত ৫৬ জনের মধ্যে বিএনপির ৩৭ জন, জামায়াতের ছয়জন ও আওয়ামী লীগের তিনজন এবং অন্যান্য আটজন, চরমপন্থি একজন এবং সাধারণ নারী একজন। এ ছাড়া এসব সহিংস ঘটনার ৬৭৩টিই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও বিএনপি বনাম অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে।

এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৬৪টি ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় কমপক্ষে ৩৮ জন নিহত ও ৯০ জন আহত হয়েছে। নিহত ৩৮ জনের মধ্যে বিএনপির ২০ জন, আওয়ামী লীগের ৯ জন, জামায়াতের চারজন এবং অন্যান্য দলের পাঁচ সদস্য। এই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় শতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ৯ শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০৪ জন, যাদের ২৩৮ জনের বয়স ১৮ বছরের কম। এর মধ্যে ৮৮ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে। ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেছে একজন। এ ছাড়া ৪৭৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ১৭৩ জন। এ ছাড়া যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ১৯ জন, আহত আটজন ও তিনজন নারী আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৩২০ জন, আহত হয়েছেন ২১১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১৪৭ জন নারী। এ ছাড়া অ্যাসিড সহিংসতায় আহত হয়েছেন চারজন নারী।

বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ এবং কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ১১ জনের মধ্যে হেফাজতে ও নির্যাতনের শিকার হয়ে পাঁচজন, গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজন এবং বন্দুকযুদ্ধে তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে গ্রেপ্তার এড়াতে পালাতে গিয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

এই সময়ে কারা হেফাজতে কমপক্ষে ৫৮ জন আসামি মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ২৬ জন কয়েদি এবং ৩২ জন হাজতি। এর মধ্যে ১৫ জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের, একজন বিএনপির এবং ৪২ জন সাধারণ কয়েদি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ছয় মাসে ৩৩১টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ৭৪ জন নিহত ও ১ হাজার ৩ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও শ্রমিকদের সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে এবং দুর্ঘটনায় ২১৬ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময় এ বছর ২৬ শ্রমিককে আটক করা হয়। এছাড়া দুজন গৃহকর্মী নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। দুই গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সময়ে ২০০ হামলার ঘটনায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৩৪ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬০ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৪৯ জন সাংবাদিক এবং ১১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর অধীনে ৩৩ জন সাংবাদিককে আসামি করে পৃথক ১৫টি মামলা হয়েছে।

এ ছাড়া এই সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩২টি হামলার ঘটনা ঘটে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় ৯ জন নিহত, ৩৫ জন আহত হয়েছেন, এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ ১৪ জন। এ ছাড়া ৩৮ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত থেকে আটক করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে অন্তত ১৭৩ জনকে পুশইন করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪১৬ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে, যা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয়রা প্রতিহত করেছে। অপরদিকে, সিলেট সীমান্তে খাসিয়া সম্প্রদায়ের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন এবং সীমান্তে একজনের লাশ পাওয়া গেছে। অপরদিকে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২০টি সহিংসতার ঘটনায় একজন নিহত, পাঁচজন আহত, গুলিবিদ্ধ পাঁচজন এবং ৮০ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় আরাকান আর্মি কর্তৃক পুঁতে রাখা স্থল মাইন বিস্ফোরণে ছয়জন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছে। 

মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে ৪০টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দেয়। এতে ৩১১ জন আহত ও ৩৮ জন আটক হন, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া এই সময়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৩০টি মামলায় ৮১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৪ জনকে।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল আচরণের পাশাপাশি দেশের সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনকে সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।