প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণে ক্রয় করা মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ৫০ হাজার টাকা বহাল থাকার পেছনে কোন শক্তির প্রভাব কাজ করেছে? প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত একশ্রেণির আমলাদের অন্যায্য প্রভাবের কাছে সরকার নতিস্বীকার করেছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, ‘সরকারি সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষ্যে সুদমুক্ত ঋণ সুবিধায় ক্রয় করা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অর্ধেক কমিয়ে ২৫ হাজার টাকা করা এবং সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত ছিল। সরকারপ্রধানের এ অবস্থানের পেছনে মূল যুক্তি ছিল বৈষম্য নিরোধ ও জনগণের অর্থের অপচয় কমানো। অথচ বাস্তবতাকে বিবেচনায় না নিয়ে সংকীর্ণ স্বার্থে সুবিধাভোগীদের প্রভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অকার্যকর করে দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে যাচ্ছে। কোন শক্তির প্রভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ব্যয়-কৃচ্ছ্রতার এই নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হচ্ছে! তা চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি এদের সুবিধাবাদী মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করা সরকারের জন্য জরুরি বলে মনে করছি।’
বিবৃতিতে বলা হয়, শুরু থেকেই তথাকথিত প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মচারীদের যে উদ্দেশ্যমূলক শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছিল, সেটি ছিল বঞ্চনা ও বৈষম্যমূলক। মাত্র ২ হাজার ৪শ কর্মচারীর বাইরে একই ক্যাডার ও সমমর্যাদাভুক্ত অন্যান্য সার্ভিসে কর্মরতদের জন্য যা ছিল গ্লানিকর। এ জাতীয় পক্ষপাতদুষ্ট সুযোগ সরকারি খাতে আন্তঃক্যাডার ভারসাম্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অধিকন্তু কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার জন্য এই সুযোগ বহাল থাকার ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে একদিকে যেমন নির্দিষ্ট পদ ও পদবির জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে তেমনি বঞ্চিতদের স্বাভাবিক কর্মস্পৃহাকে ধ্বংস করছে। এ রকম একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাসহ তার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রতিমাসে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ খরচ গ্রহণ করার অধিকতর বৈষম্যমূলক চর্চা কতটা যৌক্তিক! তা ভেবে দেখার অনুরোধ করছি’ বলে মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার ও জ্বালানি ব্যয় বহনের সিদ্ধান্ত থেকে একশ্রেণির আমলাসহ বিভিন্ন সংস্থার যারা এই জাতীয় সুবিধা উপভোগ করে আসছেন, আদৌ কি তারা ইতিবাচক কোনো শিক্ষা নিতে পেরেছেন? প্রশ্ন রেখে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলছেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের নিঃশর্ত বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক্ষেত্রে সম্পদবিবরণী প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আরোপের যে সুপারিশ ইতিপূর্বে টিআইবি করেছে, তা-ও গৃহীত হয়নি। ফলে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে জনগণ কতটা দুর্নীতি ও বিড়ম্বনামুক্ত সেবা পাবেন, সে প্রশ্ন রয়েছে। তদুপরি, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে দেশের চলমান আর্থিক সংকটে একশ্রেণির সুবিধাবাদী সরকারি কর্মকর্তাদের অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা প্রদর্শন, স্বাভাবিক কোনো দাবি বা আবদারের বিষয় নয়। বরং সরকার যে আমলাতন্ত্রের কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেছে, এটা তারই বহিঃপ্রকাশ।’

