দেশের ১০ জেলায় বন্যার শঙ্কার কথা জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলা প্লাবিত হতে পারে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা তথ্যকেন্দ্র থেকে এক সতর্কবার্তায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এদিকে অতিভারি বৃষ্টির কারণে রাজধানী ঢাকার কোথাও কোথাও অস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। অপরদিকে কক্সবাজারে পানি নেমে যাওয়ার পর দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যার ক্ষত।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা তথ্যকেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা, ধরলা, সুরমা-কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, ভুগাই ও কংস নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হবে। এ সময়ে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলায় বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ ও নাটোর জেলায় নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বৃষ্টির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। বন্যা তথ্য কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় চট্টগ্রাম বিভাগের সাঙ্গু নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে হালদা নদীর পানি হ্রাস পেয়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে। এসব নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি ও পরবর্তী দুই দিন দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
ভারি বৃষ্টিতে রাজধানীর কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতার শঙ্কা : অতিভারি বৃষ্টির কারণে রাজধানী ঢাকার কোথাও কোথাও অস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। গতকাল সোমবার এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ২২ জুলাই দুপুর পর্যন্ত রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি (৪৪-৮৮ মিলিমিটার/২৪ ঘণ্টা) থেকে অতিভারি (৮৮ মিলিমিটারের বেশি/২৪ ঘণ্টা) বৃষ্টিপাত হতে পারে। তিনি জানান, অতিভারি বৃষ্টির কারণে ঢাকা মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
কক্সবাজারে পানি নেমেছে, রয়ে গেছে ক্ষত : বন্যার পানি সরে গেছে। কিন্তু কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ জনপদে এখনো শুকায়নি মানুষের চোখের জল। ভেঙে পড়া ঘরের সামনে বসে ভবিষ্যতের হিসাব কষছেন কেউ, কেউ আবার কাদামাটিতে চাপা পড়ে যাওয়া ধানখেতের দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছেন। কোথাও ভেঙে গেছে সড়ক, কোথাও নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে বেড়িবাঁধ। মাছের ঘেরে আর মাছ নেই, পুকুরে নেই পোনা, নলকূপে উঠছে না নিরাপদ পানি। পানি নেমে যাওয়ার পর কক্সবাজারে এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা, বেঁচে থাকার নতুন লড়াই। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রাথমিক তথ্য বলছে, জেলার ১০ উপজেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি ইউনিয়ন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরি, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁও উপজেলার এসব ইউনিয়নের প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকা এবারের বন্যার কবলে পড়ে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাতটি উপজেলায় ৭ হাজার ৭১৩টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু পরিবার এখনো নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেনি। যেসব পরিবার ফিরেছে, তাদের অনেকের ঘরে নেই ব্যবহারযোগ্য আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। কাদামাটিতে ঢেকে গেছে বসতভিটা, নষ্ট হয়েছে বছরের সঞ্চয়।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামতের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিষয়েও কাজ চলছে।
কৃষি খাতের ক্ষতি জেলার খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক জানান, ২ হাজার ৭৯১ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৪৬ হাজার ২১১ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষি খাতে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৮৬ কোটি টাকা। নষ্ট হয়েছে আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজি ও অন্যান্য আবাদি ফসল। অনেক কৃষকের সামনে এখন নতুন করে বীজ, সার ও কৃষিঋণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজারে মৎস্য খাতেও ক্ষতির মাত্রা কম নয়। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, জেলার তিন হাজার ৯১৮টি পুকুর ও মাছের খামার এবং ৪৫৬টি চিংড়িঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে মাছ ভেসে যাওয়ায় ক্ষুদ্র খামারিরা কার্যত পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মন্নান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি পুনর্বাসন কার্যক্রমও চলছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দপ্তরের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন পরিকল্পনা নেওয়া যায়।

