বাগেরহাটের মোংলা থেকে কোস্ট গার্ড পরিচয়ে এক যুবককে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ওই যুবকের কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার। এই ঘটনাকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ‘গুমের প্রথম ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
এইচআরডব্লিউ অবিলম্বে মিরাজ শেখ নামে ওই যুবককে খুঁজে বের করার পাশাপাশি গুম রোধে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানিয়েছে। রবিবার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন দাবি জানায় সংস্থাটি।
মিরাজ শেখের গ্রামের বাড়ি সুন্দরবন-সংলগ্ন মোংলার জয়মণি গ্রামে, তিনি পেশায় একজন জেলে। এইচআরডব্লিউ বলছে, ৩০ বছর বয়সি মিরাজ শেখকে সর্বশেষ কোস্ট গার্ডের হেফাজতে দেখা গেছে। গত ১০ এপ্রিল রাতে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী তাকে কোস্ট গার্ড সদস্যদের আটক করে একটি স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন। পরদিন তার পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্ট গার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাদের বলা হয়, মিরাজকে নিয়ে একটি ‘অভিযান চলছে’ এবং তারা যেন বিকেলে আসে। পরে তারা আবার গেলে কোস্ট গার্ড জানায়, মিরাজ কখনোই সেখানে ছিলেন না।
একটি চায়ের দোকান থেকে মিরাজকে আটক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সেই দোকানে মিরাজের মোটরসাইকেলটিও রাখা ছিল। দোকানটির মালিক এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছেন, গত ২১ এপ্রিল এক ব্যক্তি এসে নিজেকে কোস্ট গার্ড সদস্য পরিচয় দেন এবং মোটরসাইকেলটির তালা খুলে নিয়ে যান। পরদিন কোস্ট গার্ড সদস্যরা সেটি আবার ফিরিয়েও দেন। মিরাজের পরিবারের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন এইচআরডব্লিউকে বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীরা গুমের সময়, পরিস্থিতি এবং কীভাবে কোস্ট গার্ড সদস্যরা তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন; সবকিছুই ব্যাখ্যা করেছেন।
সংস্থাটি জানায়, মিরাজের পরিবার অভিযোগ দায়ের করেছে, সংবাদ সম্মেলন করেছে এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদনও করেছে। কিন্তু এতেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরপর ১২ জুলাই মিরাজের বাবা একটি রিট আবেদন করলে হাইকোর্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ১৫ দিনের মধ্যে নিখোঁজ জেলেকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বারবার মিরাজকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং গণমাধ্যমকে বলেছেন, তার সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এইচআরডব্লিউর মতে, এই ঘটনা অতীতের এমন ঘটনাগুলোরই পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয়।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ঘটনাটি দেখাচ্ছে, প্রকৃত সংস্কার না হলে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। স্পষ্ট যে, এসব চর্চা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন সরকারের উচিত কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এইচআরডব্লিউ বলছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে এমন একটি স্বাধীন সংস্থা গঠনের ব্যাপারে ব্যাপক প্রত্যাশা ছিল, যার হাতে এসব ঘটনার তদন্তের ক্ষমতা থাকবে।
বিএনপি সরকার অর্ন্তর্বতী সরকারের আমলের এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংসদে পাস না করিয়ে এমন আইন করার প্রস্তাব করেছে, যাতে জোরপূর্বক গুমের তদন্ত পুলিশের হাতেই থাকবে এবং মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা সীমিত হয়ে দাঁড়াবে শুধু ‘সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রধান বা সরকারের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাওয়া’ পর্যন্ত। প্রস্তাবিত আইনে মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নিয়োগ ও কমিশনের বিধিমালা তৈরির ক্ষেত্রেও সরকারের প্রভাব আরও বাড়বে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, সরকারের উচিত প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে মানবাধিকার কমিশনের ওপর সব ধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ দূর করা এবং জোরপূর্বক গুম তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। পুলিশকে দিয়ে গুমের তদন্ত করালে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং এই চর্চা বন্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধও তৈরি হবে না।

