ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ ও শিক্ষা সংস্কারের দাবি

সেই জুলাইতেই উত্তাল ভারত

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ০২:৫২ এএম

কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালে দেশের রাজপথে অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তোলে এদেশের ছাত্র-যুবারা। সেই আন্দোলন কালক্রমে পরিণত হয় সরকার পতনের আন্দোলনে। দুই বছর পর তেমন চিত্রই কি দেখা যাচ্ছে প্রতিবেশী ভারতে?

এমন প্রশ্ন ওঠার কারণ হলো, ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ ও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তীব্র আন্দোলন। উল্লিখিত দাবিতে গত জুন মাস থেকেই আন্দোলন চলে আসছে দেশটিতে। এর মধ্যে গতকাল সোমবার ছিল ককরোচ জনতা পার্টির ডাকা সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা। এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এদিন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন হাজারো শিক্ষার্থী, অভিভাবক, অধিকারকর্মী ও সমর্থক যন্তরমন্তরে জড়ো হলে তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেয় পুলিশ। প্রসঙ্গত, এতদিন সরকার তাদের শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের সুযোগ দিলেও গত মাসে সিজেপিকে ‘বিশৃঙ্খলাকারী শক্তির বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেন দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

কর্মসূচি অনুসারে আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনের দিকে বিক্ষোভ মিছিল এগোতেই পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মধ্য দিল্লির একাধিক মেট্রো কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় এবং কয়েকটি এলাকায় মুঠোফোনের যোগাযোগও সীমিত করা হয়। আন্দোলনের অন্যতম নেতা অভিজিৎ দীপককে পুলিশ আটক করেছে বলে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়। একই সঙ্গে লাদাখের অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোর সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও তোলা হয়। পরে আন্দোলনের প্রতিনিধিরা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে একটি হলফনামা জমা দেন। পরে ককরোচ জনতা পার্টি দাবি করে, কেন্দ্রীয় সরকারের এক মন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত দাবিগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা খাতে অনিয়মের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন প্রথমে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করলেও সাম্প্রতিক পুলিশি অভিযানের পর আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন। এদিকে টানা ২১ দিনের অনশনের পর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়া সোনম ওয়াংচুক এখনো অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় স্বীকার এবং বিষয়টি সংসদে আলোচনার আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত তিনি অনশন ভাঙবেন না বলে জানিয়েছেন।

ভারতের ঘটনাপ্রবাহের যেন ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনের অনেক স্থানেই মিল রয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঠেকাতে সেদিন শেখ হাসিনা সরকার যেমন কঠোর ও নৃশংস দমন-পীড়নের আশ্রয় নিয়েছিলেন; ঠিক তেমনটা না হলেও ভারত সরকারও শিক্ষার্থী-জনতার এই আন্দোলন দমাতে কঠোর পথেই হাঁটছে বলে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে স্পষ্ট। আন্দোলন দমনে সেদিন বাংলাদেশে বন্ধ করা হয়েছিল ইন্টারনেট, ব্লক রেইড করা হয়েছিল বিভিন্ন এলাকায়, আটক করা হয়েছিল অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে। তেমন পর্যায়ে না গেলেও ভারতের আন্দোলনের গতিপথ কি সেই দিকেই যাচ্ছেÑ এমন প্রশ্নও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। এই প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হয় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এবং ‘ককরোচ জনতা পার্টি’Ñ এ দুটি সংগঠন নিয়ে। কারণ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন ছিল না। একইভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নাম হলেও এটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়। ব্যঙ্গধর্মী একটি প্রচার হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পরে এটি ব্যাপক জনসমর্থন পাওয়া একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। মূলত, ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারক তরুণদের ‘ককরোচ’ বলে উল্লেখ করার পর আন্দোলনকারীরা শব্দটিকে প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। এরপর থেকেই এই আন্দোলনের নাম রাখা হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

তথ্য অনুসারে, দেশটির মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পর শুরু হওয়া এই আন্দোলন এরই মধ্যে দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদেও ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। প্রসঙ্গত, গত শনিবার চলমান আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। সিজেপির সমর্থনে ২১ দিন ধরে অনশনরত শিক্ষাবিদ ও অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুককে পুলিশ জোর করে হাসপাতালে ভর্তি করলে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভ প্রত্যাহারের আহ্বান কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর : ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা বিক্ষোভকারীদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে রাজধানী দিল্লিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে নাড্ডা বলেন, আন্দোলনকারীরা প্রথমবারের মতো সকালে আলোচনার জন্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তিনি জানান, স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে ওই আবেদনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স।