মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন করে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। টানা কয়েক দিনের হামলা ও পাল্টা হামলায় পুরো অঞ্চল এখন চরম উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সামরিক অভিযান, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং পাল্টা হুমকিতে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রই নয়, বিশ^ অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তাও নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
গতকাল সোমবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। হামলায় সামরিক ঘাঁটি, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভোররাতে তাবরিজ, চাবাহার, কোনারাক, বন্দর মাহশহর, বন্দর ইমাম খোমেনি, জাস্ক, সিরিক ও বুশেহরসহ একাধিক শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কোথাও কোথাও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করা হলেও হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে ইরানও দ্রুত পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছে। তেহরানের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। বাহরাইন, কুয়েত, সিরিয়া ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।
সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার খবরও প্রকাশ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সর্বশেষ উত্তর ইরাকে একটি ভূপাতিত ড্রোনের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরণে একজন সেনা নিহত হন এবং আরেকজন আহত হন। এর আগে জর্ডানে হামলায় আরও দুই মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছিল।
এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, নিহত সেনাদের সম্মান জানাতেই ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, ইরানকে কঠিন জবাব দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও শক্তিশালী অভিযান পরিচালনা করা হবে। অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি আর কোনোভাবেই নিরাপদ থাকবে না। তাদের দাবি, এই জলপথ দিয়ে এক ফোঁটা তেল কিংবা গ্যাসও নিরাপদে পরিবহন করা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে তারা আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযানেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশে^র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। প্রতিদিন বিশে^র বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরল গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়তেই বিশ^জুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি মূল্য আরও বাড়তে পারে। এতে বিশ^ব্যাপী পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ইসরায়েলে আরও কয়েক ডজন মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী যুদ্ধবিমান মোতায়েনের প্রস্তুতির খবর নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইসরায়েলের সামরিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করছে। এর অংশ হিসেবে অতিরিক্ত সহায়ক বিমান ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে।
সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ কোরিয়া এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের দ্রুত অঞ্চল ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোকেও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে গুলিবর্ষণ এবং পরবর্তীতে আগুন লাগার ঘটনাও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পরে জাহাজটির নাবিকদের নিরাপদে উদ্ধার করা হলেও ঘটনার জন্য কে দায়ী, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোও এখন উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে এবং আকাশপথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে।
কূটনৈতিক পর্যায়েও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। উভয়পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় উত্তেজনা প্রশমনের পরিবর্তে আরও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংযমের আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত নতুন কোনো কার্যকর সমঝোতার ইঙ্গিত মেলেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সংঘাত নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান এই উত্তেজনা কতদূর গড়ায়, সেটিই এখন বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

