জুলাই অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে নারীরা ছিলেন রাজপথে সাহস, প্রতিরোধ ও নেতৃত্বের প্রতীক। ছাত্রলীগের হামলা, গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের মুখেও তারা পিছিয়ে যাননি; আন্দোলনকে সফল করতে রাখেন অগ্রণী ভূমিকা। সারা দেশে শহিদ হন ১১ নারী। তবে অভ্যুত্থানের দুই বছর না পেরোতেই বৈষম্য, উপেক্ষা ও রাজনৈতিক হতাশা তাদের রাজনীতি থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে বলে জানা যায়।
চব্বিশের দিনগুলোতে যখন লাশের সংখ্যা বাড়ে, ক্রমেই স্পষ্ট হয় জনতার সঙ্গে তৎকালীন সরকারের তীব্র অসম লড়াইÑ সে সময় দেশের সর্বস্তরের গণমানুষের সঙ্গে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন নারীরা। তবে পরবর্তীকালে কেন এই নারীরা রাজনীতিবিমুখ বা রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েনÑ তা জানা যায় তাদের কথা থেকেই।
তারা বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আমাদের নানাভাবে বুলিং ও হেয় করা হয়। এ ছাড়া অভ্যুত্থানের শক্তি যখন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে, সে সময় ক্ষমতার প্রশ্নে নারীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়। একই সঙ্গে তাদের মতামতকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। এসব কারণেই জুলাই আন্দোলনে অনেকে সম্মুখে থাকলেও পরে রাজনীতি থেকে সরে আসেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন এসব বিষয়ে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ছাত্র আন্দোলনের ডাকে রাজপথে নামাদের আমিও একজন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝেছি, কোনো আন্দোলনের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে নারীদের অংশগ্রহণের ওপর। একই সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ আন্দোলনকে গতিশীল ও সফল করে। গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তিও ছিল এখানেই। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি; বরং দীর্ঘদিনের হতাশা ও অনাস্থা থেকে দেশের মানুষ নিজের রাজনৈতিক অধিকার নিজেরাই প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল।
আন্দোলন থেকে প্রাপ্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, এই গণঅভ্যুত্থানের বড় সফলতা হলো, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায় নেই। সামান্তা বলেন, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের ভূমিকা রাখার মতো অবস্থান অত্যন্ত সীমিত। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের ছাড়া আন্দোলন সর্বজনীন চেহারা পেত না। তবে অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের ভূমিকার ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার ছিল।
এদিকে নয়া বন্দোবস্ত নিয়ে মধ্যমপন্থার রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয় এনসিপি। এতে দলটির অনেক নারী সদস্য ক্ষুব্ধ হন। সে সময়ই সম্মুখ সারির দুজনসহ বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন। তাদের মধ্যে ডা. তাসনিম জারা এবং তাজনূভা জাবীন অন্যতম। একই সঙ্গে সে সময় দলটির ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে শীর্ষ নেতার কাছে স্মারকলিপি দেন। এদিকে নুসরাত তাবাসসুম নির্বাচনি কার্যক্রমে সক্রিয় থাকবেন না জানালেও পরে জোটভিত্তিক নারী সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হয়েছেন।
সুফিয়া কামাল হল সংসদের এজিএস শিমু আক্তার বলেন, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। নারীরা ছিল সম্মুখ সারিতে এবং বৈষম্যবিরোধী নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়েই তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু গত দুই বছরে নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের ব্যাপারে কাক্সিক্ষত প্রাপ্তি আসেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আন্দোলনে ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরা সক্রিয়ভাবে মাঠে ছিল। তাদের ভেতর যে স্পিরিটটা ছিল, সেই স্পিরিটটা এই সমাজের কারণে দমে গেছে।
এদিকে আন্দোলন চলাকালে ১৪ জুলাই কোটা নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ উক্তি ঘিরে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ। সেই রাতেই হলগেটের তালা ভেঙে মিছিলে যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের নারী শিক্ষার্থীরা। তার পর থেকে যুক্ত হন সকল শ্রেণি-পেশার নারী। হাসিনা সরকারের পতন পর্যন্ত সামনে থেকেই আন্দোলনে অংশ নেন তারা। বিভিন্ন বয়সের নারীদের দেখা যায় খাবার, পানিসহ নানাভাবে আন্দোলনকারীদের সহযোগিতা করতে। তবে আওয়ামী সরকার পতনের পর যখন ক্ষমতার পালাবদলের প্রশ্ন আসে, তখন থেকেই আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারীরা বৈষম্যের সম্মুখীন হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়সহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন নারী আন্দোলনকারীর সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, আন্দোলনের পর থেকে তীব্র হয় অনলাইনে সাইবার হ্যারাসমেন্ট। বুলিং কিংবা অফলাইনে নানাভাবে হেনস্তা করার মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থানের পর থেকেই নারীদের পিছিয়ে রাখা হচ্ছিল।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারী নেত্রীদের পরিকল্পিতভাবেই দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তা করা হয়েছে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে। জুলাই অভ্যুত্থানে নারীরা সংগঠিত শক্তি আকারে সামনে ছিল। পরে খুব পরিকল্পিতভাবে তাদের দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সম্মুখ সারির নেতারা মনে করতে পারেন, নারীরা কথা বলা ছাড়া আর বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখে না। এ জন্য নারীদের নানা রকমভাবে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে।
আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছেন ১১ নারী : আন্দোলনে সরাসরি অংশ নিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে আহত হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ১৩২ শিশু-কিশোর এবং ১১ জন নারী শহিদ হয়েছেন। তথ্য বলছে, শহিদ ১১ নারীর মধ্যে রয়েছেনÑ মায়া ইসলাম, মেহেরুন নেছা, লিজা, রিতা আক্তার, নাফিসা হোসেন মারওয়া, নাছিমা আক্তার, রিয়া গোপ, কোহিনূর বেগম, সুমাইয়া আক্তার, মোসা. আক্তার ও নাঈমা সুলতানা।
উল্লেখ্য, আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তেই নারীদের প্রতিবাদী অংশগ্রহণ ছিল অনুপ্রেরণার-উদ্দীপনার। অসম আন্দোলনে শক্তিধর আওয়ামী লীগ, বেপরোয়া র্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্র-গুলির সামনে নারীরা দাঁড়িয়েছিলেন ঢাল হয়ে। তাদের প্রতিবাদ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য অভাবনীয় অনুপ্রেরণার হিসেবে কাজ করে।

