ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ‘আসক্তিকর নকশা’ বা অ্যাডিকটিভ ডিজাইন পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে মেটাকে নির্দেশ দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন (ইসি)। দুই বছরব্যাপী তদন্ত শেষে প্রকাশিত প্রাথমিক অনুসন্ধানে ইসি জানিয়েছে, এই দুটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এমন কিছু ফিচার ব্যবহার করছে, যা ব্যবহারকারীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইউরোপীয় কমিশনের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (ডিএসএ) লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইসির বিবৃতিতে বলা হয়, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের অটোপ্লে, সীমাহীন (ইনফিনিট) স্ক্রলিং, ব্যক্তিকেন্দ্রিক কনটেন্ট সুপারিশ এবং পুশ নোটিফিকেশনের মতো ফিচার ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় অ্যাপে আটকে রাখে। এসব ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের যথাযথভাবে সতর্ক করা বা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে মেটা ব্যর্থ হয়েছে বলে কমিশনের অভিযোগ।
২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই তদন্তের ভিত্তি ছিল, মেটা ডিএসএ লঙ্ঘন করছে কি না তা যাচাই করা। অনলাইন প্ল্যাটফরম নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় কমিশনের এই আইন এর আগের বছরÑ অর্থাৎ ২০২৩ সালে কার্যকর হয়।
তবে ইউরোপীয় কমিশনের এই প্রাথমিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নয় মেটা। কোম্পানিটির মুখপাত্র বেন ওয়াল্টার্স এক বিবৃতিতে জানান, তদন্তের ফলাফল তাদের গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি। তিনি বলেন, তদন্ত শুরুর পর থেকেই মেটা ‘টিন অ্যাকাউন্টস’ চালু করেছে, যা কিশোর-কিশোরীদের জন্য স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে রাতে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে বাধা দেওয়া এবং দৈনিক স্ক্রিন টাইম ১৫ মিনিট পর্যন্ত সীমিত করার সুবিধা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কিশোরদের জন্য নিরাপদ ও ইতিবাচক অনলাইন অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় কমিশনের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ চালিয়ে যাবে মেটা।
তবে ইউরোপীয় কমিশনের সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়। মেটা এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ পাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ডিএসএ লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হলে বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে। গত বছর আয়ের ভিত্তিতে সেই জরিমানার পরিমাণ ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি হতে পারে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অটোপ্লে, ইনফিনিট স্ক্রল ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুপারিশ ব্যবহারকারীদের অবচেতনভাবে একের পর এক কনটেন্ট দেখতে উৎসাহিত করে এবং মস্তিষ্ককে ‘অটোপাইলট মোডে’ নিয়ে যায়। এতে অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও বাধ্যতামূলক ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হয়। এ ছাড়া কিশোর-কিশোরীরা রাতে অ্যাপগুলোতে কত সময় ব্যয় করছেÑ এ সম্পর্কিত তথ্যও মেটা উপেক্ষা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের মতে, এসব ঝুঁকি কমাতে মেটার নেওয়া পদক্ষেপও কার্যকর নয়। সময় ব্যবস্থাপনার জন্য দেওয়া রিমাইন্ডার সহজেই উপেক্ষা করা যায়। পাশাপাশি অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ (প্যারেন্টাল কন্ট্রোল) ব্যবস্থাগুলো ব্যবহার করতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন হওয়ায় সেগুলোর কার্যকারিতা কমে যায়।
গত মাসে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ও নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইনস্টাগ্রামের কিশোর নিরাপত্তাবিষয়ক ৬৬ শতাংশ টুল হয় কার্যকর নয়, নয়তো এতটাই জটিল যে তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য সহজে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিবেদনে সময় ব্যবস্থাপনার রিমাইন্ডার সহজে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
এর জবাবে মেটা জানায়, ওই ফিচার পরিকল্পনামাফিকই কাজ করছে। এটি মূলত ব্যবহারকারীদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত তারা কত সময় অ্যাপ ব্যবহার করবে, সেই সিদ্ধান্ত তাদেরই। যদিও অভিভাবকেরা চাইলে কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে পারেন।
কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর ইনস্টাগ্রামের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনার পর ২০২৪ সালে ‘টিন অ্যাকাউন্টস’ চালু করে মেটা। ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য এতে ডিফল্ট গোপনীয়তা সুরক্ষা, সময়সীমা ও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে শর্ত হলো, ব্যবহারকারীকে সঠিক জন্মতারিখ দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। ১৬ ও ১৭ বছর বয়সিরা এসব সুরক্ষাব্যবস্থার কিছু অংশ নিজেরাই বন্ধ করতে পারে। মেটা দাবি করেছে, বয়স গোপন করার চেষ্টা শনাক্ত করতে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে, যদিও প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা কতটা, তা স্পষ্ট নয়।
ইউরোপীয় কমিশন বলেছে, মেটার উচিত অটোপ্লে ও ইনফিনিট স্ক্রলের মতো প্রধান আসক্তিকর ফিচারগুলো বন্ধ করা, যা ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের বর্তমান পরিচালনা পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পরিবর্তে সুপারিশ ব্যবস্থাকে কম সম্পৃক্ততা নির্ভর (এনগেজমেন্ট-ওরিয়েন্টেড) করারও সুপারিশ করেছে কমিশন। সূত্র : সিএনএন।

