ঢাকা সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

অস্ত্রের মজুত কমতেই যুদ্ধের গতি কমাল ওয়াশিংটন

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ০২:৩৮ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য গোলাবারুদের সীমিত মজুত নিয়ে উদ্বেগ। একই সঙ্গে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া, উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

উপদেষ্টাদের সতর্কবার্তায় বদলে যায় সিদ্ধান্ত : জানা গেছে, শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকের পরই ট্রাম্প তার অবস্থানে পরিবর্তন আনেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ব্যবহৃত প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত কমে আসার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। সামরিক কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নতুন করে বড় আকারের হামলা চালানো হলে ইরান আরও শক্তিশালী পাল্টা আঘাত হানতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে।

যুদ্ধের বিস্তার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ : মার্কিন প্রশাসনের হিসাব-নিকাশে শুধু সামরিক দিক নয়, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হতে পারে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, শরণার্থী সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র।

কূটনৈতিক সমাধানের বার্তা : হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট সব সময় কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন। তবে প্রয়োজনে সব ধরনের বিকল্পও বিবেচনায় রাখা হবে। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

দীর্ঘ সংঘাতে প্রত্যাশিত ফল মেলেনি : প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলমান সংঘাতের পরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত ফল আসেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলো ইরানকে সামরিক অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। বরং কিছু মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ধারাবাহিক হামলার ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং দেশটির নেতৃত্ব জনগণের দৃষ্টি অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে বাইরের হুমকির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

বড় হামলার প্রস্তুতি থাকলেও শেষ মুহূর্তে স্থগিত : প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক দিন আগেও ট্রাম্প আরো বড় ধরনের হামলার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু পরে সামরিক উপদেষ্টাদের সতর্কবার্তার ভিত্তিতে সেই পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়। কারণ হিসেবে জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর নিরাপত্তা এবং তাদের সুরক্ষায় ব্যবহৃত প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের দ্রুত হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

অর্থনৈতিক চাপের পথেও জোর : মার্কিন প্রশাসনের একটি অংশের মতে, সরাসরি বড় সামরিক অভিযানের পরিবর্তে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা এবং কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়াই তুলনামূলক কম ঝুঁঁকিপূর্ণ পথ হতে পারে। যদিও বর্তমানে কার্যকর আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে স্পষ্ট কোনো চিত্র নেই। একই সময়ে নৌ অবরোধ, তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়েও নতুন হিসাব-নিকাশ চলছে।

আইআরজিসির বড় দাবি : এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, তাদের পরিচালিত পাল্টা অভিযানে দুই শতাধিক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিমান, নজরদারি উড়োজাহাজ, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রাডার, অস্ত্রভা-ার এবং বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার বড় ধরনের ক্ষতি করা হয়েছে।

তবে এই দাবির বিষয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। মার্কিন প্রশাসন আইআরজিসির হতাহতের দাবি নিশ্চিত করেনি। ফলে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে আইআরজিসির মুখপাত্র দাবি করেছেন, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে সংশ্লিষ্ট সামরিক ঘাঁটি পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত হতাহতের তথ্যকে প্রত্যাখ্যান করেন। তবে এসব বক্তব্যের স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।

ইরানের নতুন হুঁশিয়ারি : ইরানের সেনাবাহিনীও সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার সামরিক হামলা শুরু করে, তাহলে যুদ্ধের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। দেশটির সামরিক মুখপাত্রদের ভাষ্য, যেকোনো নতুন আগ্রাসনের জবাব দিতে তারা প্রস্তুত এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

অনিশ্চয়তার নতুন অধ্যায় : সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অস্থির। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক অভিযান থেকে আপাতত সরে এসে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করছে। যুদ্ধের বিস্তার, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভবিষ্যৎÑ সব কিছুই এখন নির্ভর করছে আগামী দিনের সিদ্ধান্ত ও ঘটনাপ্রবাহের ওপর।