কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে সারা দেশের মতো কৃষি জমিতে আগাছা দমনে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে ধ্বংসের মুখে পড়েছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য। কৃষকদের অসচেতনতা এবং কৃষি বিভাগের সঠিক তদারকির অভাবেই ফসলের জমিতে অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর কীটনাশক মাত্রাতিরিক্ত হারে প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। যত্রতত্র এই রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে মিঠাপানির দেশীয় মাছ বিলুপ্তির পাশাপাশি হুমকিতে পড়েছে পুকুর, খাল-বিল ও নদীনালার মাছ, ব্যাঙ, শামুকসহ বিভিন্ন উপকারী পোকামাকড়।
বোরো ধান চাষের পর দীর্ঘ তিন মাস জমি পতিত থাকায় এগুলোতে কোমরসমান উঁচু আগাছা জন্ম নেয়। দেশের প্রচলিত ছোট ট্রাক্টর দিয়ে এই ঘন আগাছা ভেদ করে জমি চাষ করা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে বাধ্য হয়েই অনেক কৃষক অতি সহজে ও কম খরচে আগাছা দমনে বালাইনাশকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। কিন্তু এর বাস্তব ফলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে ঠেকেছে গ্রামীণ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য।
সরেজমিনে উপজেলার আড়াইবাড়িয়া ইউনিয়নের ভরুয়া গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক মো. সাইদুর রহমান, একই ইউনিয়নের জামাইল গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ দুলাল, পুমদী ইউনিয়নের নারায়ণ ডহর গ্রামের পঁচাত্তোর্ধ্ব আব্দুর রাশিদ, নজরুল ইসলাম (৫৫) এবং মো. নজরুল ইসলাম (৪০)-এর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় ভিন্ন এক বাস্তবতার চিত্র। তারা জানান, কৃষি শ্রমিকের তীব্র সংকট এবং উচ্চ মজুরির কারণে সশরীরে আগাছা পরিষ্কার করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। যেখানে প্রতি একর জমির আগাছা পরিষ্কার করতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে মাত্র দুই হাজার টাকা খরচেই কীটনাশকের মাধ্যমে আগাছা দমন করা সম্ভব হচ্ছে। অধিক খরচ ও শ্রম বাঁচাতে কৃষকরা তাই সহজেই কীটনাশক ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। তারা আরও জানান, এক সময়ে এসব জমিতে তিন ফসলি আবাদ করা হলেও বর্তমানে যে পরিমাণ ফসল উৎপাদন হয়, তা বিক্রি করে উৎপাদনের মূল খরচই ঠিকমতো ওঠে আসে না।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোজাহিদুল কবির জানান, ঘাস দমনে যে শক্তিশালী কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, তা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে ঘাসের সঙ্গে মিশে যায়। অজান্তেই এই বিষাক্ত ঘাস খেয়ে অনেক গরু-ছাগলের মৃত্যুর খবরও পাওয়া যাচ্ছে, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ শেখ মোহাম্মদ মহসিন জানান, কচুয়া, বথুয়া ও কচুরিপানা দমনে নির্দিষ্ট পরিমাণে ‘২,৪ ডি-এমাইন’ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে যেকোনো ধরনের রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হলেও এর কার্যকারিতা সময় সাপেক্ষ হওয়ায় কৃষকদের মাঝে তা ব্যবহারের আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে।

