কাব্যের সঙ্গে আমরা যতটা না পরিচিত, তার চেয়ে বেশি অপরিচিত মহাকাব্যের সঙ্গে। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাধারণত মহাকাব্য বলতে আমরা মহান কিছুকেই বুঝি। মর্যাদার দিক থেকে অবশ্য এটি শতভাগ যৌক্তিক। তবে পুরোপুরি না জেনে কোনো যৌক্তিক কিছুরও সাহিত্যের কাছে যথাযথ যৌক্তিকতা নেই। কাজেই গিলগামেশের মহাকাব্য সম্পর্কে জানতে হলে আগে জানতে হবে মহাকাব্য কী? মহাকাব্য সাধারণত এক ধরনের তন্ময় কাব্য। গভীর মনোযোগ বা তন্ময়তাসহকারে রচিত এ ধরনের কাব্য দীর্ঘ ও বিস্তৃত হয়। যেখানে কোনো দেশ কিংবা সংস্কৃতির বীরত্বগাথা এবং ঘটনাক্রমের বিস্তৃত বিবরণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লাভিক ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক আলবার্ট লর্ড এবং আমেরিকান ধ্রুপদি লেখক মিলম্যান প্যারীর মতে, ‘আধুনিককালের মহাকাব্যগুলো প্রকৃত অর্থে প্রাচীনকালের মৌখিকভাবে প্রচলিত ও প্রচারিত কবিতা সমগ্রেরই শ্রেণিবিভাগ মাত্র।’ তবে মহাকাব্যের কিছু বিশেষত্বও আছে। গবেষকদের মতে, ‘এ কাব্যে স্থান পায় মহাকায়, মহিমোজ্জ্বল, হিমাদ্রি-কান্তির মতো ধীর, গম্ভীর, প্রশান্ত, সমুন্নত ও মহত্ত্বব্যঞ্জক উপাদান। যেখানে কবির আত্মবাণীর চেয়ে বিষয়বাণী ও বিষয়বিন্যাসই অধিকতর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।’ গিলগামেশের মহাকাব্য ঠিক এমনই কিছু অথবা এর চেয়েও মহান কিছু। এর চেয়েও মহান বলছি এ কারণে যে, এটি প্রাচীন বিশ্বের সাহিত্যকর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। গিলগামেশ ছিল মেসোপটেমীয় পুরাণের একটি মানবিক চরিত্র। (মেসোপটেমীয় পুরাণ বলতে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া অঞ্চল থেকে আসা পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মীয় গ্রন্থ এবং অন্যান্য সাহিত্যকে বোঝায়।) তার গল্প মানবতাকে এতটাই গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল যে, মানব ইতিহাসের প্রথম মহাকাব্যে তা স্থান পেয়েছে। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সালে কিউনিফর্ম লিপিতে রচিত এই অসম্পূর্ণ মহাকাব্য সম্রাট আশুরবানিপালের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ছিল, যা বর্তমান ইরাকের অন্তর্গত প্রাচীন নিনেভেহ নগরীতে অবস্থিত। কাব্যটির মোট চরণসংখ্যা প্রায় তিন হাজার। ইলিয়াড ও ওডিসির প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে রচিত এই মহাকাব্য বহু সাহিত্য, শিল্প ও সংগীতসৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। থিওডোর জিলকোস্কি তার ‘গিলগামেশ এমং আস: মডার্ন এনকাউন্টার উইথ দ্য এনসিয়েন্ট এপিক’ (২০১১) গ্রন্থে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী গিলগামেশ ছিলেন উরুক রাজ্যের রাজা। এই কাব্যে তার দুঃসাহসিক স্বর্গাভিযানের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। গিলগামেশের কাহিনি সর্বপ্রথম পাঁচটি সুমেরীয় কবিতার মাধ্যমে শুরু হয়, যা বিলগামেশ (গিলগামেশের সুমেরীয় নাম),
উরুকের রাজাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। পরবর্তীতে এ পাঁচটি পৃথক কবিতার ভিত্তিতেই একটি মহাকাব্য রচিত হয়। রচয়িতা সম্পর্কে বলা হয়, গিলগামেশ কোনো একজন মানুষের একক রচনা নয়। হায়াৎ মামুদ শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে গিলগামেশ নামে এই মহাকাব্যের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ রচনা করেছেন। তার ভূমিকায় তিনি লিখেছেন ‘কে রচনা করেছিলেন এই উপাখ্যান, আমরা জানি না। জানা সম্ভবও নয়, কেননা কোনো একজন ব্যক্তি বা কবি তো এর রচয়িতা নন। লোকের মুখে মুখে বহু পুরুষ ধরে বংশপরম্পরায় যুগে যুগে গিলগামেশকে নিয়ে অজস্র কাহিনি প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দের কাছাকাছি কোনো এক সময়ে তা সর্বপ্রথম ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়। কোনো একজন লোক একা বসে বসে লিখেছিলেন তা মনে হয় না। বহু সময় ধরে বহু ব্যক্তি এই কাজ সম্পন্ন করেছিলেন হয়তো।’ এই মহাকাব্যের প্রথম টিকে থাকা সংস্করণটি ‘পুরোনো ব্যাবিলনীয়’ সংস্করণ নামে পরিচিত, যা খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টাদশ শতাব্দীতে রচিত। সেখান থেকে মাত্র কিছু ফলকই টিকে রয়েছে। পরবর্তীকালে প্রাপ্ত সংস্করণ খ্রিষ্টপূর্ব ১৩ থেকে ১০ শতাব্দীর। ১২ ফলকের এই সংস্করণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। সবচেয়ে ভালো সংরক্ষিত প্রতিলিপিগুলো খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর অ্যাসিরীয় রাজা আশুরবানিপালের গ্রন্থাগারের ধ্বংসাবশেষে পাওয়া যায়।
‘দ্য এপিক অব গিলগামেশ’ গ্রন্থ অনুযায়ী
প্রাচীন মেসপটেমিয়ার উরুক নগরের রাজা গিলগামেশ ছিলেন দুই-তৃতীয়াংশ দেবতা ও এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। অসীম শক্তিশালী হলেও তিনি ছিলেন অত্যাচারী ও স্বেচ্ছাচারী। প্রজাদের অভিযোগে দেবরাজ আনু দেবী আরুরুকে দিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী এনকিদুকে সৃষ্টি করেন। বনে বড় হওয়া এনকিদুকে এক সুন্দরীর মাধ্যমে সভ্য জীবনে আনা হয়। উরুকে এসে গিলগামেশের সঙ্গে তার ভয়ংকর লড়াই হয়, পরে তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠে। দুজন মিলে অরণ্যরক্ষক দৈত্য হুম্বাবাকে হত্যা করে এবং দেবী ইশতারের পাঠানো স্বর্গীয় ষাঁড়কেও পরাজিত করে। দেবতাদের ক্রোধে এনকিদুর মৃত্যু ঘটে। বন্ধুর মৃত্যুতে শোকাহত গিলগামেশ অমরত্বের সন্ধানে যাত্রা করেন। উৎনাপিশতিমের কাছ থেকে জীয়নলতার কথা জেনে তা উদ্ধার করলেও পথে একটি সাপ লতা খেয়ে নেয়। ব্যর্থ হয়ে গিলগামেশ উরুকে ফিরে এসে উপলব্ধি করেন, মানুষ অমর নয়, কর্ম ও কীর্তির মাধ্যমেই সে স্মরণীয় হয়ে থাকে।
নোট : গিলগামেশের মহাকাব্যের সংক্ষিপ্ত রূপ বাংলায় পাওয়া যাবে হায়াৎ মামুদের রচনায়। পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ হিসেবে মুহম্মদ আলমগীর তৈমূরের গিলগামেশ (পৃথিবীর প্রথম গল্প) অথবা ইংরেজিতে দ্য এপিক অব গিলগামেশ গ্রন্থটি পাঠযোগ্য।
তথ্যসূত্র :উইকিমিডিয়া কমন্স, মেন্টাল ফস ও রোর মিডিয়া

