ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

১২ মাসে ২০০ খুন চট্টগ্রামে

জালালউদ্দিন সাগর, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৪, ২০২৫, ০১:১১ এএম

দুই শতাধিক খুনের ঘটনার ‘কলঙ্ক’ মাথায় নিয়ে চলতি বছর শেষ করতে যাচ্ছে সমুদ্রবেষ্টিত বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম। বেশির ভাগ খুনের ঘটনা ঘটেছে ‘টার্গেট কিলিং’ মিশনে। আন্ডারওয়ার্ল্ড নির্দেশিত এসব কিলিং মিশন নিয়ে চলতি বছর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদ। আলোচনায় ছিলেন সারোয়ার হোসেন বাবলাও। তবে গত ৫ নভেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে বাবলাকে হত্যা করে দুই সাজ্জাদের অনুসারীরাÑ এমন অভিযোগ পুলিশ ও বাবলার পরিবারের।

সূত্র বলছে, টার্গেট কিলিংসহ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আধিপত্য বিস্তার, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং পরকিয়ার কারণে চলতি বছর চট্টগ্রাম নগরী এবং জেলায় ২০৪টি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে জেলায় হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে ১৩৫টি এবং মহানগরীতে ৬৯টি।

নগর পুলিশ বলছে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ১৫ থানার মধ্যে চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগঠিত হত্যাকা-ের মধ্যে সবচেয়ে কম হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে আকবর শাহ থানায়। বছর শেষে এই থানায় হত্যাকা-ের মামলা হয়েছে একটি। পাঁচলাইশ থানায় ২, খুলশী থানা ৩, সদরঘাট থানা এলাকায় ৩, ডবলমুরিংয়ে ৪, হালিশহর থানা এলাকায় ৪, পাহাড়তলী থানা ৫, বন্দর থানা ৫, কর্ণফুলী ৫, পতেঙ্গা ৫, বাকলিয়া থানা ৬, কোতোয়ালি ৬, বায়েজিদ ৬। ইপিজেড ও চান্দগাঁও থানায় খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। এই দুই থানা এলাকায় হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে ১৪টি (ইপিজেড ৭, চান্দগাঁও ৭)।

চট্টগ্রাম জেলার চিত্র তারচেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক। বালুমহাল নিয়ে আধিপত্য এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে চট্টগ্রাম জেলায় ২০২৫ সালে হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি।

জেলা পুলিশের তথ্যভান্ডার বলছে, চট্টগ্রাম জেলার থানাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে সীতাকু- থানা এলাকায়। এই থানায় হত্যাকা-ের মামলা হয়েছে ১৮টি। সবচেয়ে কম হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে বোয়ালখালী ও  লোহাগাড়া এলাকায়। এই দুই থানায় হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে ২টি করে ৪টি। জেলা পুলিশের  হাটহাজারী থানা এলাকায় হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে ১৪টি, রাউজান থানা এলাকায় ১২, ভুজপুর ১০, বাঁশখালী ১০, মীরসরাই ৮, ফটিকছড়ি ৮, পটিয়া ৮, আনোয়ারা ৭, জোরারগঞ্জ ৬, সন্দীপ ৬, সাতকানিয়া ৬, রাঙ্গুনীয়া ৪, দক্ষিণ রাঙ্গুনীয়া ৪, চন্দনাইশ থানায় ৪ হত্যা মামলা হয়েছে ২০২৫ সালে।

চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারীর মদুনাঘাট ব্রিজ এলাকায় বালুমহালের আধিপত্যের জেরে প্রকাশ্যে কয়েক রাউন্ড গুলি করে বিএনপি নেতা ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিমকে হত্যা করে দুষ্কৃতকারীরা। চলতি বছর ৭ অক্টোবর বিকেলে রাউজানের গ্রামের বাড়ি থেকে প্রাইভেট করে শহরে ফেরার পথে মদুনাঘাট ব্রিজের পশ্চিম পাশে পৌঁছালে একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মোটরসাইকেলে তার গাড়ির সামনে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এ ঘটনায় গত ৩১ অক্টোবর রাউজান উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের গরিব উল্লাহপাড়া এলাকা থেকে আব্দুল্লাহ খোকন (ল্যাংড়া খোকন) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। খোকনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ২ নভেম্বর রাউজানের নোয়াপাড়া ইউনিয়নের চৌধুরীহাট এলাকা থেকে মারুফ নামের আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মারুফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৪ নভেম্বর রাতে নোয়াপাড়া এলাকা থেকে সাকলাইন হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার কাছ থেকে একনলা বন্দুক, একটি এলজি ও হত্যাকা-ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সবাই হাকিম হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগে নিজের স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক মো. হাসিবকে গলা কেটে হত্যা করে জাহেদুল ইসলাম নামে এক যুবক। পুলিশের কেস ডায়েরি বলছে, প্রবাসী জাহেদুল ইসলামের স্ত্রী খায়রুন নাহার ওরফে তানহার সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায় হাসিব। দেশে ফিরে স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমের বিষয়টি জানার পর তা নিয়ে কথা বলতে হাসিবকে মুঠোফোনে ডেকে আনেন জাহিদুল। কথোপকথনের একপর্যায়ে কথা কাটাকাটি শুরু হলে হাসিবকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে জাহিদুল। চলতি বছর ৪ নভেম্বর, সোমবার দুপুরে হামজারবাগের সংগীত আবাসিক এলাকায় দুর্ধর্ষ এই হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই রাতে অভিযান চালিয়ে জাহিদুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

৫ নভেম্বর, বুধবার সন্ধ্যায় বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগ চলাকালে নগরীর চালিতাতলী এলাকায় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সারোয়ার হোসেন বাবলাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। পুলিশ জানায়, এক সময় ছোট সাজ্জাদ এবং সারোয়ার হোসেন বাবলা একসঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকা- চালালেও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়েন দুজন। স্থানীয় একটি নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে বিভক্তি শুরু হয়। এই দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। চলতি বছর গত ৩০ মার্চ নগরীর বাকলিয়া এলাকায় বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ সময় সারোয়ার হোসেন বাবলা জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে পারলেও ঘটনাস্থলে নিহত হন তার দুই সহযোগী বখতিয়ার হোসেন মানিক ও আবদুল্লাহ আল রিফাত।

মাদক মামলায় সাজা ভোগ শেষে জেল থেকে বের হওয়ার দুই দিনের মাথায় চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে খুন হন আকবর নামে এক যুবক। ৭ নভেম্বর, শুক্রবার রাতে নগরীর মাইজপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরিবারের দাবি, স্থানীয় সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির বিরোধিতা করতে গেলে এ হত্যাকা- ঘটে। ঘটনার পর পর অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত সোহেল ও আরমান নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

২৪ জানুয়ারি আছাদ আলী মাতবর পাড়ায় জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় শুঁটকি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি করে হত্যা করে মুখোশ পরা অস্ত্রধারীরা। ১৫ মার্চ রাতে হলদিয়া ইউনিয়নের আমীর হাট বাজারে সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর ব্যানার লাগানোকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া বিরোধে যুবদল কর্মী সৌদি প্রবাসী কমর উদ্দিন জিতুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯ এপ্রিল রাতে বাগোয়ান ইউনিয়নের গরিবুল্লাহ পাড়ায় যুবদল কর্মী মো. আবদুল্লাহ মানিককে ভাত খাওয়ার সময় গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর এই অনুসারী গণঅভুত্থ্যানের পর গত বছরের ১৭ অগাস্ট দেশে ফিরেছিলেন। ২২ এপ্রিল গাজীপাড়া বাজারে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসা ১০-১২ জন অস্ত্রধারী যুবদল কর্মী মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। ৬ জুলাই দুপুরে কদলপুর ইউনিয়নের ঈষাণ ভট্টের হাটে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসা হত্যাকারীদের মধ্যে দুজন ছিল বোরকা পরিহিত।

১০ জুলাই দুপুরে পার্শ্ববর্তী রাঙামাটি জেলার কাউখালীর পশ্চিম বেতবুনিয়া থেকে রাউজানের কদলপুরের বাসিন্দা যুবদল কর্মী দিদারুল আলমের লাশ উদ্ধার করা হয়। দিদারুল ছিলেন খুন হওয়া মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের সহযোগী। ২৫ অক্টোবর বিকেলে পৌরসভার চারাবটতল বাজারসংলগ্ন কায়কোবাদ জামে মসজিদের সামনে যুবদল কর্মী মুহাম্মদ আলমগীর আলমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রায় ১২ বছর কারাগারে থাকার পর এই যুবদল কর্মী গত বছরের ৫ আগস্টের পর মুক্ত হন। ১৪ অক্টোবর রাতে হাটহাজারীর চৌধুরীহাটে চিকনদন্ডী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি অপু দাশ ছুরিকাঘাতে নিহত হন। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ২১ অক্টোবর হাটহাজারী পৌরসভায় নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুহাম্মদ তানভীরকে (১৫) পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, বেশির ভাগ খুনের ঘটনাতেই আসামি গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উদ্ধার করা হয়েছে হত্যাকা-ের ক্লু। গ্যাংভিত্তিক তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার কারণে অধিকাংশ হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছে পুলিশ। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের দাবি, গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের আত্মবিশ^াস ফিরে না আসায় গ্যাংভিত্তিক তৎপরতা বেড়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পুলিশকে সক্রিয় করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নাই।’

সিএমপি কমিশনার মো. হাসিব আজিজ বলেন, ‘খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে যাতে কোনো ভীতি তৈরি না হতে পারে এজন্য কাজ করছে পুলিশ।’

তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধ কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াসহ পুলিশিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’