× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

হাসান আরিফ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩১, ২০২৬, ০১:০২ এএম

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইফোন বিলাস

হাসান আরিফ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩১, ২০২৬, ০১:০২ এএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য ‘মোবাইল বিলাস’ কর্মসূচি চালু করেছে কর্তৃপক্ষ। এই কর্মসূচির আওতায় ডেপুটি গভর্নর পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা মূল্যের মোবাইল ফোন। এই দামে আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স পাওয়া যাবে, যা আইফোন সিরিজের সর্বশেষ মডেল। আর নির্বাহী পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল্যের মোবাইল ফোন। এই দামে আইফোন ১৬ প্রো বা এর আশপাশের মডেল পাওয়া যাবে। এর বাইরে অন্য কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী মোবাইল ফোন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ সংক্রান্ত আদেশের একটি অনুলিপি রূপালী বাংলাদেশের হাতে এসেছে।

মোবাইল সেট সরবরাহের সংশোধিত নীতিমালা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও এর অধীন শাখা অফিসগুলোর কর্মরত সহকারী পরিচালক থেকে শুরু করে ডেপুটি গভর্নর পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য তিন বছর পরপর মোবাইল সেট সরবরাহের সংশোধিত নীতিমালা অনুমোদন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি গভর্নরের অনুমোদনে জারি করা এ নির্দেশনা এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে, দেশ যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের তীব্র চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন ব্যয়বহুল সুযোগ-সুবিধা কতটা নৈতিক ও বাস্তবসম্মত। এসবের মধ্যে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি চলমান রয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় আর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে যোগাযোগ করা হলে একাধিক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মোবাইল বিলাস-সংক্রান্ত কোনো তথ্য তাদের জানানো হয়নি। এই বিষয়ে তাদের পুরোপুরি অন্ধকারে রাখা হয়েছে, যা এক অর্থে সরকারের চলমান কৃচ্ছ্রসাধন নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো।

এই কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বার্ষিক উৎসব ভাতার বাইরে অতিরিক্ত বোনাস নিয়ে থাকেন। এই বিষয়েও তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না। তারা নিজেদের মতো করে যা খুশি তা বাস্তবায়ন করছেন।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফোকাল পার্সন আরিফ হোসাইন খান বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর বোর্ডে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিও রয়েছেন। তারপরও অর্থ মন্ত্রণালয় বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ যদি মনে করে এখানে কোনো সমস্যা রয়েছে, তা হলে তারা ব্যাখ্যা চাইতে পারে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাখ্যা দেবে।

কী বলা হয়েছে নতুন নির্দেশনায়

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্সপেন্ডিয়ার ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট-২ (টেলিফোন শাখা) থেকে জারি করা অফিস নির্দেশ নং ইএমডি-২-০৩-২০২৬ অনুযায়ী, সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, যুগ্মপরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক, পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক ও ডেপুটি গভর্নর- এসব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা তিন বছর অন্তর অফিস কর্তৃক মোবাইল সেট সরবরাহ সুবিধা পাবেন।

নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে, মোবাইল সেট ক্রয়ের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কোনো নগদ অর্থ দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মোবাইল সেট ক্রয় করে সরবরাহ করবে। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, পদমর্যাদা ও সিলিং প্রয়োজন অনুসারে ভবিষ্যতে পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে।

সর্বোচ্চ সিলিংয়ে ডেপুটি গভর্নর

সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী ডেপুটি গভর্নরদের জন্য মোবাইল সেটের আর্থিক মূল্যমানের সিলিং নির্ধারণ করা হয়েছে ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ সর্বোচ্চ এক লাখ ৭০ হাজার টাকা। নির্বাহী পরিচালকদের জন্য এই সিলিং এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য ধাপে ধাপে কম মূল্যমানের মোবাইল সেট নির্ধারিত হলেও উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক পর্যায়ে এই সুবিধার আর্থিক সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

এতে অভ্যন্তরীণভাবে কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। তাদের প্রশ্ন, যখন একটি মোবাইল ফোন মূলত যোগাযোগের একটি উপকরণ, তখন পদমর্যাদাভেদে এত বড় আর্থিক ব্যবধান কতটা যৌক্তিক।

বরাদ্দের তালিকায় পরিচালকদের মোবাইল সেটের আর্থিক মূল্যমান নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ হাজার টাকা, অতিরিক্ত পরিচালক বা সম পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের জন্য ৫০ হাজার টাকা, যুগ্মপরিচালক বা সম পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের জন্য ৩০ হাজার টাকা, উপপরিচালক বা সম পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের জন্য ২৫ হাজার টাকা এবং সহকারী পরিচালক বা সম পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের জন্য ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০১৯ সালের নীতিমালার ধারাবাহিকতা নাকি ব্যয়ের বিস্তার

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি নতুন কোনো সুবিধা নয়। ২০১৯ সালের ২০ মে জারি করা অফিস কর্তৃক মোবাইল সেট সরবরাহের নীতিমালার সংশোধিত সংস্করণ মাত্র। তবে বাস্তবতা হলো, ২০১৯ সালের তুলনায় বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে সময়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে চলেছে, তারল্য সংকটে অনেক ব্যাংক দিশাহারা, সেই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যয় সংকোচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করার কথা ছিল। অথচ মোবাইল সেটের সিলিং বাড়ানো এবং সুবিধার পরিধি অপরিবর্তিত রাখা একটি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।

সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাস্তবতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক ব্যাংকে এখনো মোবাইল বিল সীমিত বা পুরোপুরি নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। কোথাও কোথাও পুরোনো হ্যান্ডসেট দিয়েই দায়িত্ব পালন করতে হয়।

একজন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের সব নীতিমালার অভিভাবক। সেখানে যদি এমন বিলাসী সুবিধা থাকে, তা হলে মাঠপর্যায়ের ব্যাংকগুলোর ওপর কৃচ্ছ্রতা চাপানোর নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবমূর্তি ও জনমত

বাংলাদেশ ব্যাংক কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি আর্থিক শৃঙ্খলা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত কড়াকড়ির প্রতীক। সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করে, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই হবে সর্বোচ্চ সংযমী ও দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ।

বিশ্লেষকদের মতে, কর্মকর্তা পর্যায়ে ব্যয়বহুল সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ করে স্মার্টফোনের মতো ভোগ্যপণ্যে উচ্চমূল্যের সিলিং নির্ধারণ জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে।

প্রশাসনিক যুক্তি বনাম সামাজিক বাস্তবতা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের যুক্তি হতে পারে- উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগের প্রয়োজন, নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য ডিভাইস না থাকলে কাজের গতি ব্যাহত হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই যুক্তি কি এক লাখ সত্তর হাজার টাকার ফোন ছাড়া পূরণ করা সম্ভব নয়? বর্তমানে বাজারে অনেক মাঝারি মূল্যের ফোন রয়েছে, যেগুলো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

অন্তর্বর্তী সরকার ও ব্যয় সংযমের প্রত্যাশা

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি ব্যয় বিষয়ে জনসচেতনতা তুলনামূলকভাবে বেশি। রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন জনস্বার্থের কষ্টিপাথরে যাচাই হচ্ছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের এমন সিদ্ধান্ত আরও গভীর আলোচনার দাবি রাখে। অনেকের মতে, অন্তত সাময়িকভাবে এই ধরনের সুবিধা সীমিত রাখা বা সিলিং কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেত।

অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্ত প্রণয়নের সময় কোনো ব্যয় বিশ্লেষণ বা বিকল্প প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না। কতজন কর্মকর্তা এই সুবিধা পাবেন, এতে মোট কত টাকা ব্যয় হবে- এই তথ্যগুলো জনসমক্ষে নেই।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ছিল, এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা।

ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে এই সিদ্ধান্ত

নীতিনির্ধারকদের মতে, ছোট ছোট সুবিধার মাধ্যমেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশ নির্ধারিত হয়। যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই বিলাসী সুবিধা ধরে রাখে, তখন পুরো আর্থিক খাতে সংযমী সংস্কৃতি গড়ে তোলার বার্তা দুর্বল হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে ব্যাংক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যয় দক্ষতা বাড়ানোর মতো কঠিন লক্ষ্য অর্জনের জন্য নৈতিক উচ্চতা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য মোবাইল সেট সরবরাহের সংশোধিত নীতিমালা আইনগতভাবে বৈধ এবং প্রশাসনিকভাবে অনুমোদিত হলেও এর সামাজিক ও নৈতিক তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

একটি সংকটকালের অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত দৃষ্টান্তমূলক। মোবাইল ফোনের মতো সুবিধা হয়তো প্রশাসনিক দৃষ্টিতে ছোট বিষয়, কিন্তু প্রতীকী অর্থে এটি বড় বার্তা দেয়Ñ ব্যয় সংযমের, নাকি বিলাসের। এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি শুধু বাজেট সাশ্রয়ের জন্য নয়, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নৈতিক অবস্থান ও জনআস্থার প্রশ্নেই আজ জরুরি হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Link copied!