বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, আর্থিক দিক থেকেও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অন্যতম বৃহৎ আয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনর্প্রবর্তনের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলোর ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিন দশকে নির্বাচন ব্যয়ের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা থেকে বেড়ে কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সরকার প্রায় তিন হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য, বাজেট দলিল এবং সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোর ব্যয়চিত্রে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন, প্রযুক্তি নির্ভরতা, ভাতা ও লজিস্টিক ব্যয়ের সম্প্রসারণ, এসব কারণ মিলেই ব্যয়ের এই বিস্ফোরণ ঘটেছে।
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের ব্যয়ের গ্রাফ গত তিন দশকে ঊর্ধ্বমুখী, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে নির্বাচনি ব্যয় উচ্চমাত্রাতেই থাকবে। অর্থনৈতিক চাপ ও বাজেট ঘাটতির বাস্তবতায় নির্বাচন ব্যয়ের যুক্তিসংগতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যয় বৃদ্ধির পেছনের কারণ : বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছেÑ প্রথমত, ভোটার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯১ সালে যেখানে ভোটার ছিল কয়েক কোটি, বর্তমানে তা ১২ কোটির বেশি। ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ বৃদ্ধির ফলে ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা ব্যয় এখন নির্বাচনি বাজেটের বড় অংশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন, ভাতা ও পরিবহন ব্যয় কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তৃতীয়ত, প্রযুক্তির ব্যবহার। ছবিসহ ভোটার তালিকা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, আধুনিক সরঞ্জাম ও তথ্য নিরাপত্তা ব্যয় যুক্ত হয়েছে নতুনভাবে। চতুর্থত, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্মানী ও লজিস্টিক সহায়তা বৃদ্ধি। বর্তমানে লাখো অস্থায়ী কর্মী নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন।
তিন দশকের তুলনামূলক চিত্র : ১৯৯১ সালে যেখানে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে ২৫ কোটির কম ব্যয়ে, সেখানে ২০২৪ সালে ব্যয় দাঁড়িয়েছে চার হাজার কোটির বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৭০ গুণ বৃদ্ধি। ২০২৬ সালের জন্য বরাদ্দ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির প্রভাব থাকলেও নির্বাচনি ব্যয়ের এই দ্রুত ঊর্ধ্বগতি রাষ্ট্রীয় ব্যয় কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষত, বরাদ্দ ও প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান নীতিনির্ধারকদের জন্য আর্থিক পরিকল্পনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন : সুশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনি ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও বিস্তারিত খাতভিত্তিক প্রকাশ জরুরি। বরাদ্দের তুলনায় কেন প্রকৃত ব্যয় অনেক বেশি হয়, সে বিষয়ে নির্বাচন-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা অবশ্য বলেন, নির্বাচন একটি চলমান প্রক্রিয়া; মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে ব্যয় বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি বাড়ালে অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হয়।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ নির্বাচনে বরাদ্দ ৩১০০ কোটি টাকা : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সরকার নির্বাচন কমিশনের জন্য তিন হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানান, বরাদ্দ পাওয়া ৩১০০ কোটি টাকার মধ্যে নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ১২০০ কোটি টাকা। আর আইনশৃঙ্খলা খাতে ১৫০০ কোটি টাকা খরচ হবে। অন্যান্য খাতে ওসিভি, আইসিপিভি, গণভোট মিলিয়ে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
আজকের নির্বাচনে ভোটার আছে পৌনে ১৩ কোটি। প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে তাদের ভোট নিতে প্রায় আড়াই লাখ ভোটকক্ষ দরকার হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট দলিলে এ বরাদ্দের উল্লেখ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত ব্যয় নির্ভর করবে নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি, নিরাপত্তা মোতায়েন ও অতিরিক্ত লজিস্টিক প্রয়োজনের ওপর। অতীতে দেখা গেছে, বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ অনুমোদন করতে হয়েছে। আজকের নির্বাচনে ভোটার আছে পৌনে ১৩ কোটি। প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে তাদের ভোট নিতে প্রায় আড়াই লাখ ভোটকক্ষ দরকার হবে। এসব ভোটকক্ষে প্রয়োজন অনুসারে সিল দেওয়ার গোপন কক্ষ (মার্কিং প্লেস) থাকবে। প্রথমবারের মতো আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিংয়ের ব্যবস্থাপনাতেও খরচ আছে।
২০২৪ সালের নির্বাচন : ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৪) ব্যয় ছিল দুই হাজার ২৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাহিদা অনুযায়ী সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ২২৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। নির্বাচন পরিচালনা খাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ৫০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ওই নির্বাচনে ১৯২৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল।
নির্বাচনে নিরাপত্তা খাতে ব্যয় ছিল উল্লেখযোগ্য। কয়েক লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন, প্রশিক্ষণ, ভাতা, যানবাহন ও সরঞ্জাম বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। এ ছাড়া নির্বাচন পরিচালনায় প্রযুক্তি, ব্যালট পেপার মুদ্রণ, সরবরাহ ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয়ও বাড়ে। ফলে বরাদ্দ ও প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ ব্যবধান সৃষ্টি হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচন : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৮) উপলক্ষে সরকার নির্বাচন কমিশনের জন্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। যদিও পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত ব্যয়ের হিসাব বিভিন্ন খাতে বিভক্ত, নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ভোটার সংখ্যা ১০ কোটির বেশি হওয়ায় কেন্দ্র পরিচালনা, কর্মকর্তা নিয়োগ ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়।
২০১৪ সালের নির্বাচন : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৪) অনুষ্ঠিত হয় তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ব্যয় হয় প্রায় ২৬৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনায় ৮১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেছনে ব্যয় হয় ১৮৩ কোটি টাকা।
এ নির্বাচনে ১৪৭ আসনে ভোট হয়, ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন একক প্রার্থীরা। অর্ধেক এলাকায় ভোট করতে হওয়ায় বরাদ্দের তুলনায় খরচ অনেক কমে আসে। যদিও অনেক আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, তবুও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়।
২০০৮ সালের ডিজিটাল যুগের নির্বাচন : নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০৮) ছিল সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট। এই নির্বাচনে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। ভোটার তালিকা হালনাগাদে ডিজিটাল পদ্ধতি, ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রস্তুত এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি, এসব কারণে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। নির্বাচনে ভোটার ছিল আট কোটি ১০ লাখের বেশি।
২০০১ সালের নির্বাচন : অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০১) ছিল একটি পূর্ণমাত্রার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৭২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। সে সময় ভোটকেন্দ্র ও ভোটার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। নির্বাচন কমিশন মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা বাড়ায়, যা ব্যয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
১৯৯৬ সালের দ্বৈত নির্বাচন : ১৯৯৬ সালে দু’দফা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ এবং ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচন। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয় হয় বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ আছে। রাজনৈতিক সংকটের কারণে জুনে পুনরায় নির্বাচন আয়োজন করতে হয়; ওই নির্বাচনে ব্যয় হয় প্রায় ১১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
একই বছরে দুইবার ভোট আয়োজন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছিল। যদিও জুনের নির্বাচনটি তুলনামূলক সীমিত পরিসরে হওয়ায় ব্যয় কম ছিল।
১৯৯১ সালের নির্বাচন : ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় ভোট। সে সময় নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। দেশে তখন ভোটার সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম, প্রযুক্তি ব্যবহার ছিল সীমিত এবং নিরাপত্তা ব্যয়ের পরিধিও বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক ছোট।
১৯৮৮ সালের নির্বাচন : এ ছাড়া চতুর্থ সংসদ (১৯৮৮) জাতীয় নির্বাচনে ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল।
১৯৮৬ সালের নির্বাচন : তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৯৮৬) ব্যয় হয় পাঁচ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
১৯৭৯ সালের নির্বাচন : দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৯৭৯) ব্যয় হয় দুই কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং প্রথম সংসদ নির্বাচনে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ তিন কোটি ৫২ লাখ পাঁচ হাজার ৬৪২ জন ভোটারের এ নির্বাচনে ব্যয় ছিল ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন