বাংলাদেশের ফুড ডেলিভারি খাত মানেই দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি অ্যাপের দাপট। এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ইউএস বাংলা গ্রুপের বিনিয়োগে বাজারে আসে ‘ফুডি’। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই উদ্যোগ আজ দেশের ২৭টি জেলা-শহরে বিস্তৃত, মাসে প্রায় ১০ লাখ অর্ডার ডেলিভারি দিচ্ছে, যুক্ত করেছে হাজার হাজার রেস্টুরেন্ট ও রাইডার। এই গল্পটা ফুডিরÑ একটি অ্যাপ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার গল্প।
যাত্রার শুরু, প্রশ্ন থেকেই যার জন্ম
ফুডির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০২৪ সালের জুনে। তবে এই যাত্রার পেছনে ছিল একটি সরল কিন্তু শক্ত প্রশ্নÑ ‘আমাদের দেশের মানুষের খাবারের চাহিদা পূরণে নেতৃত্ব দেবে কেন বিদেশি কোনো প্ল্যাটফর্ম?’
ইউএস-বাংলা গ্রুপের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুরু থেকেই স্পষ্টÑ এদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস এবং সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ফুডিকে গড়ে তোলা। কেবল ব্যবসা নয়, বরং একটি দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করে বিদেশি অ্যাপগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েই ফুডির জন্ম। আমরা বিশ্বাস করি, এদেশের ফুড ডেলিভারি মার্কেটকে একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুন্দরভাবে এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা ও সক্ষমতা আমাদেরই সবচেয়ে বেশি। সেই দেশপ্রেম এবং আত্মনির্ভরশীলতার তাড়না থেকেই ফুডি তার যাত্রা শুরু করেছে।
বিস্তৃতি : ঢাকা ছাড়িয়ে জেলা শহর
বর্তমানে ফুডির কার্যক্রম রয়েছে ঢাকাসহ ২৭টি জেলা ও শহরেÑ ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, বগুড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, দিনাজপুর, ফরিদপুর, ফেনী, গাজীপুর, জয়দেবপুর, যশোর, খুলনা, কিশোরগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, রাজশাহী, রংপুর, সাভার, সিদ্ধিরগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, সিলেট, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, কক্সবাজার এবং টঙ্গী। এই বিস্তৃত উপস্থিতি ফুডির কৌশলের ইঙ্গিত দেয় যে, শুধু রাজধানী-কেন্দ্রিক না থেকে ধাপে ধাপে বিভাগীয় শহর, এরপর জেলা শহরে শক্ত অবস্থান তৈরি করা।
সংখ্যায় ফুডি
১২ হাজারের বেশি রেস্টুরেন্ট, ক্লাউড কিচেন এবং শপ পার্টনার নিবন্ধিত রয়েছে ফুডিতে। আর এসব প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রাহকদের দেওয়ার অর্ডার তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে রয়েছে ১০ হাজার ৫০০ এরও বেশি নিবন্ধিত রাইডার। প্রতিমাসে ৯ থেকে ১০ লাখের বেশি সফল ডেলিভারি করছে ফুডি।
খাবারের বাইরেও ‘ফুডি’
ফুডি নিজেকে কেবল ‘খাবার পৌঁছে দেওয়া’ অ্যাপে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ধীরে ধীরে এটি হয়ে উঠছে একটি লাইফস্টাইল প্ল্যাটফর্ম, গড়ে তুলছে একটি ‘৩৬০ ডিগ্রি ইকোসিস্টেম’। ফুল ডেলিভারির জন্য ‘ফুডি ফ্লাওয়ার’, লোকাল ও গ্লোবাল পণ্যের অনলাইন শপিং নিয়ে ‘ফুডিশপ’, প্রেসক্রিপশন দরকার নাই এমন ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের জন্য ‘ফুডিফার্মা’ সেবা রয়েছে প্ল্যাটফর্মটির। তবে ফুডির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মো. শাহনেওয়াজ মান্নান জানান যে, ফুডির সেবাবহরে আরও নতুন নতুন সেবা যুক্ত হচ্ছে। শাহনেওয়াজ মান্নান বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং সদাই পণ্য ডেলিভারি করতে ফুডিতে দ্রুতই যুক্ত হচ্ছে ‘ফুডিমার্ট’। এই বহুমুখী সেবার লক্ষ্য একটাই যে, একটি অ্যাপেই দৈনন্দিন প্রয়োজনের সমাধান।’
খাবারের অপচয় রোধে ‘ফুড রেসকিউ’
বাংলাদেশে ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে অনন্য এক ফিচার রয়েছে ‘ফুডির। ‘ফুড রেসকিউ’ নামক এই ফিচারের মূল উদ্দেশ্য খাবারের অপচয় রোধ করা। শাহনেওয়াজ মান্নান বলেন, ‘বেঁচে যাওয়া বা ডেলিভারি না হওয়া খাবার যেন কোনোভাবেই অপচয় না হয়, সেজন্য ফুডি চালু করেছে একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ ‘ফুড রেসকিউ’। যখনই কোনো অর্ডার ক্যানসেল বা ডেলিভারি করা সম্ভব হয় না, সেই খাবারটি নষ্ট না করে সরাসরি ফুডি অ্যাপের মাধ্যমে মাত্র অর্ধেক দামে গ্রাহকদের কেনার সুযোগ করে দিই। এর ফলে একদিকে যেমন খাবার নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের রাইডারদের আয়ের সুযোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই উদ্যোগটির সাফল্য অবিশ্বাস্য। ২০২৫ সালের মে থেকে ডিসেম্বরÑ মাত্র সাত মাসেই ১৫ হাজারের বেশি খাবারের অপচয় রোধ করা গেছে, যার আর্থিক মূল্যমান প্রায় দেড় কোটি টাকা। মাত্র ২ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে গ্রাহকরা এসব খাবার কিনে নেন।’
কঠিন বাজার, তবু সম্ভাবনা
সহজ ফুড, উবার ইটসÑ অনেকেই এই বাজারে ব্যর্থ হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ নিয়েও ফুডপ্যা-ার লড়াই চলছেই। এমন প্রেক্ষাপটেও শক্তিশালী ইকোসিস্টেম, নিয়মিত ইনসেনটিভ, গ্রুপ অর্ডার সুবিধা এবং রাইডারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ; এসব মিলে বাংলাদেশের বাজারে শক্ত অবস্থান অর্জনে আত্মবিশ্বাসী ‘ফুডি’। দ্রুত ডেলিভারি আর নিরবচ্ছিন্ন সেবা গ্রাহকদের ফুডিতে আস্থা বাড়াচ্ছে বলে মনে করে প্রতিষ্ঠানটি। শাহনেওয়াজ মান্নান বলেন, বাংলাদেশের ফুড ডেলিভারি মার্কেট প্রতি বছর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। দৈনিক কয়েক লাখ অর্ডারের বড় অংশ এখনো অফলাইনে হয়। এই বিশাল সম্ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করতেই ফুডি ধাপে ধাপে নতুন এলাকা ও সেবা যুক্ত করছে।
রাইডার : ফুডির প্রাণশক্তি
ফুডি বলছে, খাবার সরবরাহের এই কার্যক্রমের সফলতার অন্যতম চালিকাশক্তি তাদের বিশাল রাইডারবাহিনী। রাইডারদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে ফ্রি টি-শার্ট, ব্যাগ ও অন্যান্য সরঞ্জাম, ই-বাইক ও স্মার্টফোন, স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনাজনিত বিমা, বিশেষ সংকটে আর্থিক সহায়তার মতো সুবিধাদি রয়েছে ফুডির পক্ষ থেকে। পাশাপাশি কাজের প্রতি উৎসাহ বৃদ্ধিতে রাইডারদের জন্য কক্সবাজার ট্রিপসহ বিশেষ উপহার এবং সেরা রাইডার নির্বাচনের মতো উদ্দীপক কার্যক্রম রয়েছে ফুডির।
রমজানে ফুডির বিশেষ কার্যক্রম
চলছে পবিত্র মাহে রমজান। এই সময়ে নির্দিষ্ট সময়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইফতারি এবং সেহরি গ্রহণ করেন। তাই সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ফুড ডেলিভারি করা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য। ফুডি বলছে, এই চাপ মোকাবিলায় রমজানে ইফতার ও সেহরিকে ঘিরে বিশেষ প্রস্তুতি রয়েছে প্ল্যাটফর্মটির। রমজানে খাবারের দামে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়, ফ্রি ডেলিভারি, সেলফ পিক-আপ এ অতিরিক্ত মূল্যছাড়, জনপ্রিয় ইফতার বাজারের আয়োজনগুলোর সঙ্গে পার্টনারশিপের মাধ্যমে এই রমজানে গ্রাহকদের সেবা দিতে প্রস্তুত ফুডি। এই রমজান মাসে ৬ থেকে ৭ লাখের বেশি অর্ডার সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
শাহনেওয়াজ মান্নান বলেন, ‘ফুডি’র গল্প আসলে একটি অ্যাপের সাফল্য নয়; এটি দেশীয় উদ্যোগের আত্মবিশ্বাসের গল্প। যেখানে ব্যবসা, প্রযুক্তি আর সামাজিক দায়িত্ব একসঙ্গে হাঁটে। বিদেশি দাপটের বাজারে দাঁড়িয়ে ফুডি দেখাচ্ছে যে ঠিক পরিকল্পনা আর স্থানীয় বাস্তবতার বোঝাপড়া থাকলে দেশীয় ব্র্যান্ডও নেতৃত্ব দিতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন