বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনের মুক্তিসহ তিন দফা দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে জেলার সব আদালত বর্জন করছেন আইনজীবীরা। এতে হাজিরা, জামিন ও মামলার শুনানির জন্য আসা বিচারপ্রার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বরিশাল জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, মানুষের ভিড় জমতে শুরু করেছে। হাতে ফাইল, পকেটে হাজিরার কাগজ। কেউ বারান্দার এক কোণে বসে অপেক্ষা করছেন। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও আদালতের ভেতরে ঢোকার ডাক আসেনি। এজলাস খোলা, বিচারকও উপস্থিত, কিন্তু আইনজীবী নেই। ফলে বিচার কার্যক্রম প্রায় থেমে আছে।
মেহেন্দিগঞ্জের আন্ধারমানিক থেকে আসা সালেহা বেগম বলেন, ‘দূর থেকে এসে বসে আছি। কোর্ট কবে খুলবে জানি না। এত দূর বারবার আসা তো সম্ভব না।’ ঢাকা থেকে মামলার হাজিরা দিতে আসা মো. মনির বলেন, ‘ঢাকা থেকে এসেছি। যদি আজ কোনো সমাধান না হয়, তাহলে আমরা বড় সমস্যায় পড়ব। আদালত চালু হওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি।’
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যসচিব আবুল কালাম আজাদ ইমন বলেন, ‘আমাদের তিনটি দাবিÑ সমিতির সভাপতিকে মুক্তি দিতে হবে, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করতে হবে এবং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যেন কগনিজেন্স না দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা আদালত বর্জনে আছি। পাশাপাশি সমঝোতার কথাও চলছে। আমরা চাই বিষয়টি ভালোভাবে নিষ্পত্তি হোক, বার ও বেঞ্চের সম্পর্ক অটুট থাকুক। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো সমাধান না আসে, তাহলে কেন্দ্রীয়ভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সেখান থেকে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশে কর্মসূচি চলবে।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আহ্বায়ক ও মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি নাজিমউদ্দিন আহমেদ পান্না বলেন, বরিশাল বারের সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে বুধবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম তার অধীনস্থ কর্মচারীর মাধ্যমে একাধিক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীসহ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করিয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার দুটি আদালত বর্জন করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে বরিশালের সব আদালত বর্জনের কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে। বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির বিষয়ে তিনি বলেন, বড় একটি মঙ্গলের জন্য কখনো কখনো ছোট ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতে হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর সাঈদ চৌধুরী বলেন, ফ্যাসিবাদের সময় নিয়োগ পাওয়া বিচারকেরা ফ্যাসিবাদীকে জামিন দিয়েছেন। তার প্রতিবাদ করায় বারের সভাপতিসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি বলেন, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তারের বিধান নেই। অথচ সভাপতিকে তার কার্যালয় থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আদালত বর্জন চলবে।
প্রসঙ্গত, গত সোমবার বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসকে জামিন দেন অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত। ওই জামিনের প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল থেকে মুখ্য মহানগর হাকিম ও অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত বর্জন করে বিক্ষোভ করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। বিক্ষোভের একপর্যায়ে আদালতের এজলাসে হট্টগোল ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। তখন বিচারক এস এম শরিয়তুল্লাহ এজলাস ত্যাগ করেন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরদিন কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়। এরপর বুধবার বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তার গ্রেপ্তারের পর থেকেই টানা আদালত বর্জনের কর্মসূচি চলায় বরিশালের বিচার কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন