সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের কী পদ্ধতিতে অর্থ ফেরত দেওয়া যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কাজ শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ব্যাংকটিকে ঘিরে চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, আর্থিক স্থিতি ও আইনি কাঠামোর প্রেক্ষাপটে শেয়ারধারীদের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষা নিয়ে এখন নীতিগত ও কারিগরি উভয় পর্যায়েই পর্যালোচনা চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগের ফলে ব্যাংকের শেয়ারহোডারদের অর্থ পাওয়ার আশা বাড়ছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শেয়ারধারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করা হবে, এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সর্বশেষ লেনদেনের কর্মদিবসে বাজারদরকে ভিত্তি ধরা হবে, নাকি শেয়ারের অভিহিত মূল্য (ফেস ভ্যালু) ধরে হিসাব করা হবে, দুই পদ্ধতিতেই প্রাথমিক হিসাব-নিকাশ করা হচ্ছে। শেয়ারসংখ্যা, হালনাগাদ মালিকানা তালিকা, এবং সম্ভাব্য আর্থিক দায়Ñ এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও আইনসম্মত কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, শেয়ারমূল্য নির্ধারণের প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি একই সঙ্গে আইনগত ও নীতিগত প্রশ্ন। যদি সর্বশেষ লেনদেন দিনের বাজারদরকে ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে বাজারের বাস্তব চাহিদা-জোগান, বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা ও তৎকালীন আর্থিক পরিস্থিতি প্রতিফলিত হবে। তবে বাজারদর কখনো কখনো অস্বাভাবিক ওঠানামার শিকার হতে পারেÑ বিশেষত যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট, অনিশ্চয়তা বা গুজবের প্রভাব থাকে। সে ক্ষেত্রে বাজারদর শেয়ারটির অন্তর্নিহিত মূল্য পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও করতে পারে।
অন্যদিকে, অভিহিত মূল্য ধরে হিসাব করলে একটি নির্ধারিত ও স্থিতিশীল ভিত্তি পাওয়া যায়। কিন্তু ফেস ভ্যালু সবসময় কোম্পানির প্রকৃত সম্পদমূল্য, দায় বা আর্থিক কর্মক্ষমতার প্রতিফলন নয়। ফলে কোন পদ্ধতিতে শেয়ারহোল্ডাররা ন্যায্যতা পাবেনÑ সেই ভারসাম্য নির্ধারণই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র জানায়, দুই পদ্ধতিতেই সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাবের হিসাব করা হচ্ছে। শেয়ারসংখ্যা ও সম্ভাব্য অর্থের পরিমাণ নির্ধারণের কাজ চলছে। এর সঙ্গে যুক্ত আছে শেয়ারহোল্ডারদের পরিচয় যাচাই, আইনগত বৈধতা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘শেয়ারধারীরা ব্যাংকের মালিক। শেয়ারের বাজারদর যদি কোনো সময় নেতিবাচক প্রবণতায় পড়ে কিংবা শেয়ারের মূল্যহ্রাস ঘটে, তবুও মালিকানা অস্বীকার করার সুযোগ নেই’। ‘দাম কমতে পারে, কিন্তু মালিকানা তো কমে না’Ñ এমন মন্তব্য করেন এক কর্মকর্তা। তাঁর মতে, মালিকানা কাঠামোর দিক থেকে শেয়ারহোল্ডাররা মূল স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ; ফলে তাদের সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত রেখে কোনো সমাধান টেকসই হবে না।
এই অবস্থান থেকেই অর্থ ফেরতের একটি ন্যায্য ও কার্যকর পদ্ধতি বের করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যাংকের সার্বিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় আমানতকারী, ঋণদাতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। এই বিষয়ে বর্তমান অর্থমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাজ করার জন্য বলেছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর তিনি কর্মকর্তাদের সাথে ফের আলোচনায় বসবেন।
এই প্রেক্ষাপটে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ অতীতে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিও আলোচনায় রয়েছে। তিনি বলেছেন, আর্থিক খাতের যেকোনো পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় আইনি কাঠামো ও আর্থিক ন্যায্যতা একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শেয়ারধারীদের অধিকার ও দায়Ñ দুটিই স্বীকার করতে হবে। কোনো ব্যাংক যদি পুনর্গঠন বা কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তবে তার মালিকানাগত প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে সমাধান টেকসই হবে না।
তিনি আরও মত দেন, বাজারভিত্তিক মূল্য ও অভিহিত মূল্যের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্পদ-দায় বিশ্লেষণ জরুরি। ব্যাংকের নিট সম্পদ, আর্থিক অবস্থান, সম্ভাব্য ক্ষতি এবং পুনর্গঠনের রূপরেখাÑ এসব বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে। নইলে এক পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত ও অন্য পক্ষ অযথা সুবিধাপ্রাপ্ত হতে পারে।
বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেছেন, সরকার আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও আস্থা পুনঃস্থাপনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ, আমানতকারীদের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাÑ সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কোনো তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নেওয়া হবে না; বরং সবদিক বিবেচনায় নিয়ে একটি সুসংহত নীতিগত সিদ্ধান্ত আসবে।
তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আর্থিক খাতের সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মালিকানাগত প্রশ্নগুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ, বিশেষজ্ঞ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতামত নেওয়া হচ্ছে।
শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ ফেরতের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে গিয়ে কয়েকটি আইনগত প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, ব্যাংকের বর্তমান আইনগত অবস্থান কীÑ তা স্পষ্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শেয়ারহোল্ডারদের দাবির পরিধি কীÑ তা নির্ধারণ জরুরি। তৃতীয়ত, শেয়ারমূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি আইনি পরীক্ষায় টিকবে কি নাÑ তা যাচাই করতে হবে।
যদি বাজারদরকে ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে কোন তারিখের দর গ্রহণযোগ্য হবেÑ সর্বশেষ লেনদেন দিনের? নাকি নির্দিষ্ট সময়ের গড় মূল্য? আবার যদি অভিহিত মূল্য ধরা হয়, তাহলে শেয়ার ইস্যুর শর্তাবলি ও কোম্পানির নিবন্ধন দলিলও পর্যালোচনা করতে হবে।
প্রশাসনিক দিক থেকেও কাজটি সহজ নয়। শেয়ারসংখ্যা যাচাই, হালনাগাদ রেজিস্টার প্রস্তুত, অনাদায়ী লেনদেন বা আইনি জটিলতা চিহ্নিত করাÑ এসব ধাপে সময় লাগছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলছে, সঠিক তথ্য ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
এখানে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়Ñ শেয়ারহোল্ডারদের কতটুকু এবং কীভাবে অর্থ দেওয়া হবে? যদি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান দুর্বল হয়, তাহলে সরাসরি নগদ অর্থ ফেরত দেওয়া কি সম্ভব? নাকি কোনো পুনর্গঠন-পরবর্তী ইকুইটি রূপান্তর বা অন্য কোনো কাঠামো বিবেচনায় আসতে পারে? যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রস্তাব ঘোষণা হয়নি, তবুও আলোচনায় রয়েছেÑ সমাধান হতে হবে বাস্তবসম্মত ও আইনি ভিত্তিসম্পন্ন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারহোল্ডারদের পুরোপুরি উপেক্ষা করলে বাজারে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। আবার অতিরিক্ত আর্থিক দায় সৃষ্টি করলে তা রাষ্ট্রীয় আর্থিক স্থিতি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সক্ষমতার ওপর চাপ ফেলতে পারে। ফলে ‘ন্যায্যতার সংজ্ঞা’ নির্ধারণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বিষয়ে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই দায় পরিশোধের জন্য কোন খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হবে তার উৎস নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো পুরো উদ্যোগই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।
ব্যাংকিং খাত মূলত আস্থাভিত্তিক। কোনো একটি ব্যাংককে ঘিরে মালিকানাগত বা আর্থিক বিতর্ক দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব গোটা খাতে পড়তে পারে। তাই অর্থ মন্ত্রণালয় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এমন একটি পথ খুঁজছে, যাতে একদিকে শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে সামগ্রিক বাজার আস্থাও অটুট থাকে।
সূত্র বলছে, সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে। শেয়ারহোল্ডারদের কাছে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হবেÑ কী ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে এবং কেন সেই ভিত্তি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যৎ আইনি জটিলতা কমবে এবং নীতিগত গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ ফেরতের পদ্ধতি নির্ধারণ একটি জটিল ও বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া। শেয়ার সংখ্যা, মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি, আইনগত কাঠামো, আর্থিক সক্ষমতাÑ সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রণয়নই এখন লক্ষ্য।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের নীতিগত অবস্থান এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যÑ দুটিই ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে। শেয়ারধারীরা ব্যাংকের মালিকÑ এই নীতিগত অবস্থান থেকেই সমাধান খোঁজার চেষ্টা চলছে।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট মহল বলছেÑ সমাধান হবে আইনি, আর্থিক ও নৈতিকÑ তিন দিকেই গ্রহণযোগ্য এমন একটি কাঠামোর ভিত্তিতে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন