সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুতে সংসদের উত্তাপ গড়াচ্ছে রাজপথে। গণভোটের আলোকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ-সমাবেশের ডাক দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দল। অন্যদিকে, গণতন্ত্রের স্বার্থে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান চায় বিএনপি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলোচনার পথ বাদ দিয়ে রাজপথ বেছে নিলে সহিংসতার শঙ্কা থাকে, যার সুযোগ নিতে পারে তৃতীয় পক্ষ। আজ শনিবার বাদ আসর রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ-সমাবেশ করার কথা রয়েছে তাদের। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের এমন আলটিমেটামের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা গণভোট, গুম প্রতিরোধ, দুদক সংস্কারসহ ২০টি অধ্যাদেশ সংসদের চলতি অধিবেশনে অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে না বলেই জানা গেছে। এর ফলে কার্যকারিতা হারাচ্ছে এসব অধ্যাদেশ। এ ছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ক্ষমতা বাড়িয়ে করা অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধে করা অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এটি হলে এ অধ্যাদেশগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। ১০ এপ্রিলের পর এগুলো কার্যকারিতা হারাবে। সব মিলিয়ে মোট ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
সরকারের অনড় অবস্থানের বিরোধিতা করে সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে ওয়াকআউট করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল। মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার পর জুলাই সনদ আদেশ জারি না করা এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে মিসকোড করার অভিযোগ এনে বুধবার ৫টা ৪৫ মিনিটে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান। যদিও প্রথম দিনের সংসদ অধিবেশনেও রাষ্ট্রপতির ভাষণ দিতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই ওয়াকআউটের অভিষেক ঘটায় জামায়াতের নেতৃত্বে বিরোধী দল।
দুদকের তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধান ক্ষমতা বাড়িয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করা হয় ২০২৫ সালে। এতে সরাসরি এজাহার দায়েরের বিধান, বিদেশে সংঘটিত অপরাধসহ গুরুতর আর্থিক অপরাধকে আইনের আওতায় আনা, কমিশনের সদস্য বাড়ানোর বিধান করা হয়। এ বিষয়ে জামায়াতের সদস্যরা ভিন্নমত জানিয়ে বলেছেন, তারা অধ্যাদেশটি হুবহু পাসের পক্ষে। সরকারি দলের পক্ষ থেকে এ অধ্যাদেশ বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু এই অধ্যাদেশ দুর্নীতি দমন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বহুল আলোচিত গুম প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। গুম থেকে সব ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিধানাবলি বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এ অধ্যাদেশ করা হয়। এতে গুমকে ‘চলমান অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এর সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদ-। পরে সংশোধনী এনে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি অন্তত পাঁচ বছর ধরে গুম থাকলে ট্রাইব্যুনাল তার সম্পত্তি বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনযোগ্য ঘোষণা করতে পারবে।
যে অধ্যাদেশগুলো অনুমোদনের জন্য হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে, তার মধ্যে আছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবার এবং জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কিছু অধ্যাদেশ আছে। এগুলোতে বিশেষ পরিস্থিতি ও জনস্বার্থে প্রশাসক নিয়োগের বিধান করা হয়। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের আপত্তি আছে। এ ছাড়া এ তালিকায় আছে বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যামেন্ডমেন্ট অর্ডিন্যান্স ২০২৪, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত কতিপয় আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ (বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে উল্লিখিত বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা, শেখ হাসিনা ইত্যাদি নামের পরিবর্তন)। গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট), জাতীয় সংসদের সীমানা নির্ধারণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু অধ্যাদেশ আছে, যেগুলো নাম পরিবর্তন-সংক্রান্ত।
এমন একসময়ে শপথ নিয়েছে বিএনপি সরকার, যখন চারদিকে শুধু সংকট আর সমস্যা। শপথ নেওয়ার এক দিন পরই শুরু হয়ে যায় পবিত্র রমজান। রমজানে দ্রব্যমূল্য বাড়ানো নিয়ে অতিমুনাফার প্রবণতা থেকে এবারও বেরিয়ে আসতে পারেনি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা। তবু নিঃশব্দে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে গেছে সরকার। আগের মতো ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজেদের প্রচারণা করতে দেখা যায়নি নতুন সরকারকে। সরকার গঠনের এক মাসের কম সময়ে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে সরকার। ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় নেতাদের ভাতাসহ বেশ কিছু পাইলট প্রকল্প শুরু করেছে সরকার। বিএনপি সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে বিন্দু পরিমাণ পিছু হটবে না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। ভোটের কালি শুকানোর আগেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে বলেই স্বস্তির ঢেঁকুর তুলছে সরকার।
হাজারো প্রত্যাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংকট যেন পিছু ছাড়ছেই না। বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে অর্থনৈতিক চাপ, আইনশৃঙ্খলার উদ্বেগ এবং প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা একই সঙ্গে দৃশ্যমান। এই পরিস্থিতি ভয়াবহ মনে হলেও ইতিহাস বলে- সংকটই বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে। নতুন সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি আঘাত করছে। সমস্যা যখন আসে তখন চারদিক থেকে আসে বলে প্রচলিত। নতুন সরকার যখন দেশের সংকট সমাধানে আপ্রাণ চেষ্টা করছে তখন শুরু হয়েছে ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধ। ইসরায়েল-মার্কিনদের যৌথ প্রযোজনার এই হামলায় জ্বলছে তেল আবিব। আগুনের নদী ইরানের পথে-প্রান্তরে। নগর যখন পোড়ে তখন দেবালয়ও এড়ায় নাÑ ইরানের আগুনের তাপ মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই। জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশেই। আমদানিনির্ভর এই তেলের দাম অতীতের সরকার যেভাবে বাড়িয়েছে নানা ছুতোয়, নতুন সরকার তা বেশ দক্ষতার সঙ্গেই নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে বলা যায়।
বিএনপি নেতারা বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বৈধ আইন নয় জানিয়ে সরকারি দল সংবিধান সংশোধনে শিগগিরই একটি কমিটি করার উদ্যোগ নিয়েছে। এতেই নাখোশ বিরোধী দলগুলো। সংসদে আলোচনার টেবিল ছেড়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথ বেছে নিচ্ছে বিরোধী শিবির। যদিও বিরোধী দলের এমন আন্দোলনকে পাত্তা দিতে রাজি নয় সরকারি দল।
সংসদ ছেড়ে রাজপথের কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের বিরোধের সুযোগ নিতে পারে তৃতীয় কোনো পক্ষ। জাতীয় সংসদকে সব সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করার তাগিদ দেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (শিল্প মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত) রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিরোধী দল বিরোধিতা করবে, এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এখন কি পরিস্থিতি বিক্ষোভ করার মতো। দেশে কত সংকট, ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে তেল নিয়ে তেলেসমাতি চলছে। সরকার চেষ্টা করছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে। সরকার চায় মানুষের কল্যাণে কাজ করতে আর বিরোধী দল অযথা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। সরকার আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধান চায়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন