ঢাকা রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬

জ্বালানি বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন

নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের  কর এক শতাংশ করার দাবি

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ০৫:৪৮ এএম

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, সৌর ও বায়ুশক্তির বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নীতিগত বৈপরীত্য, উচ্চ কর এবং অর্থায়নের অভাবে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, জাতীয় অর্থনীতি এবং ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর গ্রিন লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য উৎস : চাই বাজেটের নীতিগত পরিবর্তন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)। সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ, ল-ইয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড), এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। অনুষ্ঠানের ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্লিনের নেটওয়ার্কিং এডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা। আলোচনায় অংশ নেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক (অধিকার ও সুশাসন) বনশ্রী মিত্র নিয়োগী, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম, লিডের গবেষণা পরিচালক অ্যাডভোকেট শিমনউজ্জামান এবং ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী।

উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা বনাম বাস্তবায়নের উদ্বেগজনক ঘাটতি

দেশে বর্তমানে জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট স্থাপিত সক্ষমতা মাত্র ১,৬৭৯ মেগাওয়াট, যা জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অত্যন্ত কম। অথচ বাংলাদেশে সৌর ও বায়ুশক্তি মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতির ওপর ২৭ থেকে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত কর ও শুল্ক আরোপ করে খাতটির বিকাশকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

বর্তমানে সৌর প্যানেল ও ইনভার্টারের ওপর প্রায় ২৬.৯ শতাংশ কর আরোপ করা হলেও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নীতিগত সুবিধা অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির খরচ কৃত্রিমভাবে বেড়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। অথচ এই কর থেকে সরকারের আয় জাতীয় রাজস্ব আয়ের মাত্র ০.০৫ শতাংশেরও কম। জ্বালানি নিরাপত্তার নামে বাংলাদেশকে একটি ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় ৩ কোটি ১১ লাখ টাকার জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় করতে পারে এবং ১ হাজার ১৮০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন রোধ করতে সক্ষম এবং প্রতি কিলোওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় ৩১ হাজার টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে। তবুও জাতীয় বাজেটে এই খাতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা নেই।

কি ভাবছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগণ

ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানিতে অব্যাহত ভর্তুকি ও প্রণোদনার পরিবর্তে আসন্ন জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, কর-শুল্ক অব্যাহতি এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। এখনই এই পরিবর্তন না আনলে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভরতার এক দীর্ঘস্থায়ী চক্রে আটকে থাকার ঝুঁকিতে পড়বে’। 

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়, আর শিল্পায়ন ছাড়া বেকারত্ব কমানোও সম্ভব নয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত এখনো প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পাচ্ছে না। সরকার চাইলে আসন্ন বাজেটে কর ও শুল্ক কমিয়ে সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগের পথ সহজ করতে পারে। এটিই হবে জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ’।

লিডের গবেষণা পরিচালক অ্যাডভোকেট শিমনউজ্জামান বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে এখনো বড় ধরনের ফারাক রয়ে গেছে। এই ব্যবধান দূর করতে না পারলে জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। তাই আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য শক্তিশালী নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন’।

ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের সার্বভৌমত্ব অর্জন আর জ্বালানি সার্বভৌমত্ব একই সূত্রে গাঁথা। নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিল্প খাতের অবকাঠামো ও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি’।

সংবাদ সম্মেলন থেকে আসন্ন জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য নি¤œলিখিত সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়- ১. প্রতীকী শুল্কায়ন : আগামী ১০ বছরের জন্য সকল নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর কাস্টমস ডিউটি, ভ্যাট ও অগ্রিম করসহ সর্বমোট করের হার প্রতীকী ১ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে, ২. ২৫ হাজার কোটির আবর্তনশীল তহবিল : স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ৫% এর কম সুদে ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে ২৫,০০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ আবর্তনশীল তহবিল গঠন করতে হবে, ৩. আবাসিক ও প্রান্তিক ভর্তুকি : আবাসিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে কমপক্ষে ২৫,০০০ টাকা সরাসরি ভর্তুকি এবং নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ১০% ভর্তুকি দিতে হবে, ৪. গ্রিড স্থিতিশীলতা ও নীতি সংস্কার : নতুন অনুমোদিত ইউটিলিটি-স্কেল প্রকল্পে ন্যূনতম ২০% ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ (ইঊঝঝ) বাধ্যতামূলক করা, করপোরেট বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নির্দেশিকা সক্রিয় করা এবং প্রগতিশীল নির্গমন কর (ঊসরংংরড়হ ঞধী) আরোপ করা, সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি : যুব উন্নয়ন ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে যুবকদের প্রশিক্ষিত করে প্রতি বছর ১০ লাখ পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।