ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

কাজ শেষ না হতেই ধস ৫২৭ কোটি টাকার বাঁধ

সামজীদ হোসেন
প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৬:১৪ এএম

পদ্মা নদীর ভয়াল ভাঙন থেকে মুন্সীগঞ্জের বিস্তীর্ণ জনপদ রক্ষার লক্ষ্যে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি স্থায়ী তীর সংরক্ষণ বাঁধ। প্রকল্পটির প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও নির্মাণাধীন অবস্থাতেই বাঁধের একটি অংশে ধস দেখা দিয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, স্রোতের তীব্রতা আরও বাড়লে বাঁধের বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে।

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে গাঁওদিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে পদ্মার তীর রক্ষা বাঁধের কয়েকটি সিসি (কংক্রিট) ব্লক হঠাৎ সরে গিয়ে নদীতে তলিয়ে যায়। প্রথমে অল্প কয়েকটি ব্লক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই বড় একটি অংশ ধসে পড়ে। কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই এ ঘটনা ঘটায় মুহূর্তেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, যে বাঁধকে নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেটি নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। ফলে প্রকল্পের নির্মাণকাজ, ব্যবহৃত উপকরণের গুণগত মান এবং তদারকি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা বহুমুখী সেতুর ভাটিতে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নদীর বাম তীর সংরক্ষণের লক্ষ্যে ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প ২০২১ সালের অক্টোবরে শুরু হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই বাঁধে ধস দেখা দেওয়ায় পুরো প্রকল্পের কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা শফিক খান জানান, গত রোববার বিকেলে হঠাৎ করেই বাঁধে ধস নামতে শুরু করে। প্রথমে কয়েকটি সিসি ব্লক সরে যায়। পরে বড় অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। তিনি বলেন, ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটেছে যে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

স্থানীয় মো. আলমগীর বলেন, বিকেলে দেখি বাঁধের ব্লক একের পর এক নদীতে পড়ে যাচ্ছে। রাতে আতঙ্কে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছি। এখন বুঝতে পারছি না, সামনে কী হবে বা কোথায় গিয়ে থাকব।

মো. আচালত মিয়া বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে পদ্মার ভাঙনে আমাদের সবকিছু হারিয়েছি। নতুন বাঁধ নির্মাণ হওয়ায় মনে হয়েছিল এবার হয়তো নিরাপদে বসবাস করতে পারব। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষের আগেই যদি বাঁধের এই অবস্থা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কী হবে?

ধসের ঘটনার পর গত সোমবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু। তিনি জানান, খবর পাওয়ার পর রাতেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং যাতে নতুন করে ক্ষয়ক্ষতি না বাড়ে, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

তবে স্থানীয়দের দাবি, কেবল তাৎক্ষণিক সংস্কার নয়, পুরো বাঁধের নির্মাণমান যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ধসের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণেরও জোর দাবি জানান তারা।