দেশে গত দুই বছরে কারাবন্দি অবস্থায় যারা মারা গেছেন, তাদের ‘অধিকাংশেরই হৃদরোগে’ আক্রান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে চলতি বছরের ৬ জুলাই পর্যন্ত ২২৭ কারাবন্দির মৃত্যুর তথ্য জানা যায়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এমন বক্তব্য পাওয়া গেছে কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন গতকাল সোমবার গণমাধ্যমকে বলেন, অধিকাংশ মৃত্যুই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া) থেকে। মাদকসেবী বন্দি যারা আসেন, তারা এখানে মাদক না পাওয়ার একটা বিষয় আছে। আর অনেকেই এখানকার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় ডিপ্রেশনে বা ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েন। এসব কারণে তারা ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাছাড়া চিকিৎসক সংকটও আমাদের বড় সমস্যা।
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনÑএমএসএফ বলেছে, গেল দুই বছরে মারা যাওয়া ২২৭ জনের মধ্যে ৪০ জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। আবার আইন ও সালিশ কেন্দ্রÑআসক কোনো দলীয় নেতাকর্মী পরিচয় না দিয়ে বলেছে, প্রায় একই সময়ে কারাবন্দি ১৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর কারা কর্তৃপক্ষ দলীয় পরিচয় না দিয়ে বলেছে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত ৩৪২ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
এমএসএফের হিসাবে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ বছর ৬ জুলাই পর্যন্ত কারাবন্দি ২২৭ জনের সঙ্গে ৩০ জন মারা যান পুলিশ হেফাজতে। অন্যদিকে, ২০২৪-এর আগস্ট থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত আসকের হিসাবে ২২ জন গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে মারা গেছেন। এমএসএফ কারাবন্দির ব্যাপারে বলেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ওই বছর তিনজন, ২০২৫ সালে ২২ জন এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ১৫ নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়। এ সময়ে পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন আওয়ামী লীগের তিনজন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৪ জন কারাবন্দির মৃত্যু হয়েছে। এরপর ২০২৫ সালে ১০৭ জন এবং এ বছর জুন পর্যন্ত ৬১ জন মারা গেছেন। তবে তাদের কোনো দলীয় পরিচয় দেয়নি সংগঠনটি।
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা তদন্ত হয়ে থাকে উল্লেখ করে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, এক্ষেত্রে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তদন্ত করে দেখা হয়। কারো কোনো গাফলতি থাকলে তার বা তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।
আসক তাদের পরিসংখ্যানে বলছে, সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে ৭ জন এবং একই সময় কারাগারে ২৪ জন মারা গেছেন। ২০২৫ সালে গ্রেপ্তারের পর নির্যাতনে মারা যান ১১ জন এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মারা যান ৪ জন। এ সময়ে কারাবন্দি মারা গেছেন যথাক্রমে ১০৭ এবং ৫৯ জন। এমএসএর পরিসংখ্যান হচ্ছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন ৩০ জন। আর এই সময়ে কারা হেফাজতে মারা যান ২২৭ জন।
কারা কর্তৃপক্ষ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ২০২৪ সালে ১৮৯ জন, ২০২৫ সালে ১৩৬ এবং এ বছর ৬ জুলাই পর্যন্ত ১৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালের আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ২৩২ জন।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে বলে জানান এমএসএফ প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিটি জেলায় আমাদের প্রতিনিধি আছে। তাদের দেওয়া তথ্য এবং জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকশিত তথ্য যাচাই করে আমরা প্রতিবেদন তৈরি করি। তার ভাষ্য, অনেক ঘটনাই প্রকাশ পায় না বা জানা যায় না, ফলে যে সংখ্যা প্রকাশিত হয়, হেফাজতে মৃত্যু তার চেয়ে বেশি।
বগুড়া কারাগারে থাকা পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু বেশ অলোচিত হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে কারা কর্তৃপক্ষ সে সময় বলেছিল। গত সপ্তাহে কারাগারে বন্দি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মনির নামে এক যুবলীগ নেতার মৃত্যুর পেছনে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন দলীয় নেতাকর্মীরা। তাদের ভাষ্য, মনিরের বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা দেওয়া হয়। একেকটি মামলায় জামিন পেলেও আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে রাখা হয়। প্রায় ১৭ মাস ধরে তিনি কারাগারে ছিলেন এবং মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন