× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রেজাউল করিম খোকন

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১, ২০২৬, ০২:৫৯ এএম

দৃঢ়তা, সাহস ও আপসহীনতার নাম খালেদা জিয়া  

রেজাউল করিম খোকন

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১, ২০২৬, ০২:৫৯ এএম

দৃঢ়তা, সাহস ও আপসহীনতার নাম খালেদা জিয়া  

আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিরবিদায় আমাদের মেনে নিতে অনেক কষ্ট হয়। বুকের ভেতর কষ্ট বেদনা দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। আহা, তিনি যদি আরও কিছুদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকতেন, তাহলে খুব  ভালো হতো। এসব তার প্রতি আমাদের গভীর অনুরাগ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আর আবেগের প্রকাশ। তার প্রতি এক ধরনের গভীর আস্থার প্রকাশ বৈকি। তবে শেষ পর্যন্ত মনে শক্ত পাথর বেঁধে সব শোক, কষ্ট বেদনা সহ্য করতে হয় একজন মানুষ হিসেবে। দেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত এই বরেণ্য রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে জাতি এক অভিভাবককে হারাল। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

মৃত্যুর আগে এক কঠিন সময় পার করেছেন হার না মানা এই নেত্রী। ফুসফুসে সংক্রমণসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা নিয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ৮০ বছরের জীবনে নানা রোগ বাসা বেঁধেছিল তার শরীরে। তাই শেষ সময়ে বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময় হয়ে উঠেছিল। সম্প্রতি শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউ-সমমানের হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) রাখা হয়েছিল। তারপর থেকেই প্রতি মুহূর্তে দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়জুড়ে ছিল দেশনেত্রীর সুস্থতায় গভীর উদ্বেগ ও প্রার্থনা। বেগম খালেদা জিয়ার সুস্বাস্থ্য দেশের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গণতন্ত্র উত্তরণের এই কঠিন সময়ে তার উপস্থিতিও ছিল অপরিহার্য। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশের জন্য খালেদা জিয়ার ত্যাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বারবার। অসুস্থতা সত্ত্বেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির চেয়ারপারসনের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের চিন্তা ও মতামত ভীষণ জরুরি ছিল।  বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। কারণ, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান ছিল দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। তিনি ছিলেন সকল বিতর্ক, সমালোচনার ঊর্ধ্বে। সম্প্রতি তার জন্য দোয়া চাইতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের এ সময়ে খালেদা জিয়া জাতির জন্য ভীষণ রকম অনুপ্রেরণা।’ বেগম খালেদা জিয়া সারাজীবন দেশে ও জনগণের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করতে গিয়ে তাকে ভীষণ নিষ্ঠুরভাবে ফ্যাসিস্ট শাসকদের হাতে নির্যাতিত হতে হয়েছে। এ নির্যাতন এতটাই নির্মম ছিল যে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার জীবন বিপন্ন অবস্থায় পড়ে যায়। দেশের জন্য তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন; তবুও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। তাই দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এটি একজন রাজনৈতিক অভিভাবকের প্রতি নাগরিকদের অকৃত্রিম ভালোবাসার বহির্প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।

জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতিতে দিশারীর ভূমিকা পালন করেন। দেশের একজন মুরুব্বি ও অভিভাবক হিসেবে তার নীরব-নিঃশব্দ অনেক ভূমিকা ছিল। মূলত বেগম জিয়ার উপস্থিতিই ছিল প্রত্যাশিত গণতন্ত্রের জন্য বড় অনুপ্রেরণার শক্তি। তার এই অভিভাবকত্বকে সব রাজনৈতিক দল শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছিল। এই অভিভাবকসুলভ চরিত্রই তাকে আজীবন অমর করে রাখবে। এরই মধ্যে ইতিহাসে তার জন্য গৌরবোজ্জ্বল স্থান নির্ধারিত হয়ে গেছে।

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির তখন কঠিন দুঃসময়। দেশে চলছে এরশাদের সামরিক শাসন; গভীর সংকটে দেশ। সেসময় ঘোর অনীহা সত্ত্বেও প্রথমে কর্মী এবং পরে দলের হাল ধরতে রাজনীতির মাঠে নামতে হয়েছিল একজন গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়াকে। তখন তার পরিচয় ছিল তিনি শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী। তার কোনো বিশেষ রাজনৈতিক অভিলাষ ছিল না, ছিল না কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। সেই থেকে শুরু তার চার দশকের রাজনীতির পথচলা। এর মধ্যেই এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে সাহসী নেতৃত্ব দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন নেত্রী। রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রাখার আট বছরের মাথায় হয়েছিলেন দেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী। এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছিল তাকে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুর্নীতির মামলায় কারাবরণ এবং তারপর শারীরিক অসুস্থতা; এসব কারণে ২০১৮ সাল থেকে বিএনপির রাজনীতিতে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তবুও শেখ হাসিনার প্রতিষ্ঠিত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর লড়াই করেছে তার নেতৃত্বাধীন দলটি। দলের অসংখ্য নেতাকর্মীর মতোই তার মাশুল দিয়েছেন খালেদা জিয়া নিজেও। অত্যন্ত খারাপ শারীরিক অবস্থাতেও দীর্ঘদিন অন্যায়ভাবে জেলে আটক ছিলেন। পরবর্তীতে এই অসুস্থতাই তাকে মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে গেছিল। বিএনপি চেয়ারপারসনের অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ার পেছনেও হাসিনা সরকারের ঘৃণ্য, কুটিল ষড়যন্ত্র ক্রিয়াশীল ছিল। অসুস্থতা কিংবা রাজনীতির মাঠে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও তিনি দলের লাখো কর্মীর আবেগ ও অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন।

খালেদা জিয়া রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে এত বছর দেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুদ্ধ করেছিলেন। অনেক কষ্ট পেয়েছেন; জেলে গেছেন; অনেক কটুকথাও শুনেছেন। কিন্তু তিনি প্রতিশোধ নেননি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দেশ ছেড়ে যাননি। বেগম খালেদা জিয়া সবসময় বলতেন, ‘এই দেশ আমার, এই দেশ ছেড়ে কোনোদিনই যাব না, এদেশের জনগণের সঙ্গে আমি থাকব।’ সেজন্য দল-মত নির্বিশেষে তিনি একটি আলাদা উচ্চতায় পৌঁছে গেছিলেন। যাকে বলা হয় ‘মুরুব্বি’; তার দিকে সবাই উপদেশের জন্য তাকিয়ে থাকত। দেশের এই সময়ে তার সুস্থ হয়ে ফিরে আসাটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার সুস্থ হয়ে ফিরে আসার প্রতীক্ষায় যখন দল ও পুরো দেশ, আগামী বাংলাদেশের জন্য তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব যখন একান্ত জরুরি ছিল তখনই তাকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরবিদায় নিতে হলো। তিনি দেশের গণতন্ত্র, মানুষের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য আপসহীন সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি শুধু বিএনপি নয়, এ দেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। তিনি আছেন গণতন্ত্রের দৃঢ়তম প্রতীক হিসেবে। বেগম খালেদা জিয়া সংকটাপন্ন অবস্থায় যখন হাসপাতালে সবাই তার রোগমুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে দোয়া করেছেন যেন তিনি ঘরে ঘরে সবার পরম প্রিয় এক আপনজন ছিলেন।

জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও দৃঢ় অবস্থান ছিল দেশের জন্য এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে সবসময়ই আমাদের নেত্রী ছিলেন আপসহীন। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তার সুস্থতা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য অপরিহার্য ছিল। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের কোটি কোটি প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠস্বর। রাজপথে আন্দোলন করে সম্মুখদ্বার দিয়ে প্রবেশ করে তিনি রাজনীতিতে নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বঞ্চিত মানুষের গণতান্ত্রিক তথা অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক অনন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে সকল দলের কাছে বিবেচিত হয়েছেন তিনি। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া কয়েক দশক ধরে অবিচল ভূমিকা পালন করে গেছেন। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রচক্রের লাগাতার নির্যাতন, মিথ্যা মামলার পরিক্রমা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়াবহতার মাঝেও তার অটল মনোবল ও আপসহীন অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, স্বৈরতন্ত্রবিরোধী সংগ্রাম এবং পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রত্যেকটি পর্বে খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা, দেশপ্রেম ও নেতৃত্ব জাতীয় জীবনে গভীর প্রভাব রেখেছিল। বাংলাদেশের বহু প্রজন্ম তাকে দেখেছে সাহস, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। দীর্ঘ প্রতিকূলতা, সীমাহীন চাপ ও কঠিন বাস্তবতার মাঝেও তিনি যে দৃঢ়তা, সাহস ও আপসহীন নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে। 

মহান আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতবাসী করুন। তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। আমিন।

রেজাউল  করিম খোকন :  অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!