স্নিগ্ধ ভোরে গাছের ডালে গড়িয়ে পড়া কুয়াশা বিন্দু, দূর থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক, জোয়ারের পানির শব্দ কিংবা পাতার মর্মর ধ্বনিÑ প্রকৃতির এই চিরচেনা রূপেই অভ্যস্ত হতে চেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু সবুজ অরণ্যও আজ যেন ক্লান্তÑ মানুষের লোভ, অবহেলা ও নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞে বিপর্যস্ত। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় থেকে শুরু করে দেশের হাওরাঞ্চল ও পার্বত্য চট্টগ্রামÑ প্রকৃতির যে অপার সম্ভার বাংলাদেশকে অনন্য করেছে, তা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, পাহাড় কাটা পড়ছে, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে; আর প্রকৃতি নীরবে যেন তার প্রতিশোধের প্রস্তুতি নিয়ে চলেছে।
প্রতি বছর ২২ মে পালিত ‘বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস’ তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম ক্রান্তিকালে মানবসভ্যতার টিকে থাকার প্রশ্নে এক গভীর সতর্কবার্তা।
জীববৈচিত্র্য বলতে শুধু বাঘ, হাতি কিংবা বিরল পশু-পাখিকেই বুঝানো হয় না; এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্রতম অণুজীব থেকে বিশাল বনভূমি পর্যন্ত সমগ্র প্রাণজগৎ ও বাস্তুতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি উদ্ভিদ, এমনকি একটি ক্ষুদ্র মৌমাছিও জীবনের এই মহাচক্রে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে থাকে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার-এর লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট বলছে, গত ৫০ বছরে বিশ্বে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা গড়ে প্রায় ৬৯ শতাংশ কমে গেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি পৃথিবীর প্রাণভোমরা ধীরে ধীরে নিভে যাওয়ার এক ভয়াবহ উপাখ্যান।
বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক সংকটের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা হ্রাস, হাওরাঞ্চলের জলজ প্রাণীর বিলুপ্তি, পার্বত্য অঞ্চলে নির্বিচারে পাহাড় কাটা এবং নদীদূষণÑ সব মিলিয়ে দেশের বাস্তুতন্ত্র ভয়াবহ হুমকির মুখে। দেশের অধিকাংশ বড় নদী এখন শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণের শিকার। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় ধ্বংসের ফলে বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি। অন্যদিকে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চল ক্রমেই সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের কাছে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। কৃত্রিম চিংড়ি ঘের সম্প্রসারণ, অবৈধভাবে গাছ কাটা ও দূষণের মাধ্যমে আমরা এই সুরক্ষাবলয়কেই দুর্বল করে তুলছি। এই আত্মঘাতী প্রবণতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
প্রকৃতির সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং একই সঙ্গে ভয়ংকর সত্য হলোÑ এখানে সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিজ্ঞানীরা একে অভিহিত করেন চেইন রিঅ্যাকশন বা বাটারফ্লাই ইফেক্ট হিসেবে। উদাহরণ হিসেবে মৌমাছির কথাই ধরা যাক। পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ খাদ্যশস্য কোনো না কোনোভাবে পরাগায়নের ওপর নির্ভরশীল, যার বড় অংশ সম্পন্ন করে মৌমাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ। যদি এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো বিলুপ্ত হতে শুরু করে, তাহলে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ফল, শাকসবজি ও শস্যের উৎপাদন কমে গিয়ে বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। অর্থাৎ, একটি ছোট প্রাণীর হারিয়ে যাওয়া শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, আবহাওয়া হয়ে উঠছে অনিশ্চিত, আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিচ্ছে ভয়াবহ রূপ। সুন্দরবন কেবল একটি বন নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয়। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা কিংবা আম্পানের সময় এই বন লাখো মানুষকে রক্ষা করেছে। কিন্তু বন উজাড় ও দূষণের কারণে যদি সুন্দরবন দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতের ঘূর্ণিঝড় আরও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। প্রকৃতির এই প্রাকৃতিক প্রাচীর ভেঙে পড়লে কংক্রিটের শহর কোনো নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে পরিবেশ রক্ষায় আইনগত কাঠামো থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ এখনো দুর্বল। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কিংবা নদী রক্ষা কমিশনÑ সবই রয়েছে, কিন্তু প্রয়োগের ঘাটতি প্রকট। নদী দখলদাররা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় পার পেয়ে যায়; পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলে সাময়িকভাবে, এরপর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। বাজার থেকে সমুদ্র পর্যন্ত প্লাস্টিক দূষণ এখন এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। নাগরিকদের মধ্যেও পরিবেশ নিয়ে এক ধরনের উদাসীনতা তৈরি হয়েছে। আমরা প্রতিদিন প্লাস্টিক ব্যবহার করি, নদীতে ময়লা ফেলি, গাছ কাটাকে উন্নয়ন মনে করি; কিন্তু বুঝতে চাই না, এই ধ্বংসযজ্ঞ শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের জীবনকেই বিপন্ন করছে।
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই উদ্যোগ। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন, নদী ও বন রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ, নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রা এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি টিকে থাকার শর্ত। তরুণ প্রজন্ম এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে জলবায়ু আন্দোলন ইতোমধ্যে নীতিনির্ধারকদের ভাবতে বাধ্য করেছে। বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল পর্যায়ে পরিবেশ আন্দোলন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পৃথিবীতেও প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান ছাড়া মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপদ নয়Ñ এই উপলব্ধি নতুন প্রজন্মের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি জাগ্রত হচ্ছে।
বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস তাই এখন আত্মসমালোচনার দিন। উন্নয়নের নামে আমরা কী হারাচ্ছি, সেটি উপলব্ধি করার দিন। কারণ প্রকৃতি কখনো হঠাৎ করে ধ্বংস হয় না; ধ্বংসের আগে সে অসংখ্যবার সতর্কবার্তা দেয়। নদীর কালো পানি, নিঃশব্দ বন, হারিয়ে যাওয়া পাখি কিংবা অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহÑ সবই সেই অশনিসংকেত।
সবশেষে একটি নির্মম অথচ চিরন্তন সত্য আমাদের মনে রাখতে হবেÑ প্রকৃতি মানুষকে ছাড়া বাঁচতে পারলেও, মানুষ প্রকৃতিকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না। জীববৈচিত্র্য রক্ষা তাই কেবল পরিবেশবাদীদের দায়িত্ব নয়; এটি মানবসভ্যতা টিকিয়ে রাখার লড়াই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ ও সাম্যময় বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের এই আত্মঘাতী পথ থেকে ফিরে আসতেই হবে।

