ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সম্পাদকীয়

ঈদযাত্রায় নিরাপদ মহাসড়ক নিশ্চিত করা হোক

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: মে ২৫, ২০২৬, ০১:২৪ এএম

দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয় মহাসড়ককে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য, শিল্পকারখানার কাঁচামাল, রপ্তানিপণ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও নির্ভর করে এই সড়কপথের ওপর। অথচ সেই মহাসড়কগুলোই আজ ভয়, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্র, চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট, অজ্ঞান পার্টি ও মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে,  রাষ্ট্র কি তবে মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে? সরকার এত নীরব কেন?

প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক থেকে যেসব খবর আসছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং সংগঠিত অপরাধব্যবস্থার ভয়ংকর বিস্তারের ইঙ্গিত। কোথাও চলন্ত ট্রাকে লোহার রড বা পাইপ ছুড়ে ডাকাতি করা হচ্ছে, কোথাও পশুবাহী ট্রাক থামিয়ে অস্ত্রের মুখে গরু লুট করা হচ্ছে, আবার কোথাও ভুয়া ডিবি পুলিশ বা হাইওয়ে পুলিশের পরিচয়ে চেকপোস্ট বসিয়ে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এমনকি পুলিশের গাড়িতেও ডাকাতির চেষ্টা হয়েছে যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝার জন্য যথেষ্ট।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমাঞ্চল, হাটিকুমরুল-বনপাড়া সড়ক কিংবা কুমিল্লা-সীতাকু- অংশ প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রুটেই এখন আতঙ্কের ছায়া। রাত নামলেই যেন মহাসড়কগুলো অপরাধীদের দখলে চলে যায়। যাত্রীরা ভয়ে গাড়ি থামাতে চান না, চালকেরা ঝুঁকি নিয়ে পথ পাড়ি দেন, আর ব্যবসায়ীরা কোটি টাকার পণ্য নিয়ে আতঙ্কে থাকেন। ঈদ সামনে রেখে কোরবানির পশুবাহী ট্রাকগুলো এখন সবচেয়ে বড় টার্গেটে পরিণত হয়েছে। কারণ অপরাধীরা জানে, এই সময় সড়কপথে নগদ অর্থ ও মূল্যবান পণ্যের প্রবাহ সবচেয়ে বেশি থাকে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এত কিছুর পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হচ্ছে না কেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে কয়েকটি কঠিন বাস্তবতা। যার মধ্যে, দেশের বিশাল মহাসড়ক নেটওয়ার্কের তুলনায় হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। সারা দেশে প্রায় ৯ হাজার কিলোমিটার মহাসড়কের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো অত্যন্ত দুর্বল। রাজধানীর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতেও সিসিটিভি ক্যামেরা অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। ফলে অপরাধীরা সহজেই শনাক্তকরণ এড়িয়ে যাচ্ছে।

সেই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও ‘স্টপেজ সন্ত্রাস’ মহাসড়ককে আরও অনিরাপদ করে তুলেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ চেকপোস্ট বসিয়ে পণ্যবাহী যানবাহন থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ বহু পুরোনো।

আমরা মনে করি, মহাসড়কের এসব অনিয়ম আতঙ্ক বন্ধ করার জন্য প্রয়োজন কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দেশের সব মহাসড়ককে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ হাইওয়ে পুলিশিংয়ের আওতায় আনতে হবে। সেইসঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে,  যার মধ্যে থাকবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল মোবাইল ইউনিট। আর মহাসড়কে চাঁদাবাজি ও ভুয়া চেকপোস্টের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মহাসড়কের নিরাপত্তা কেবল পুলিশের একার দায়িত্ব নয়। এটি সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের বিষয়। কারণ নিরাপদ মহাসড়ক ছাড়া নিরাপদ অর্থনীতি সম্ভব নয়।

ঈদ সামনে রেখে কোটি মানুষ যখন পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরতে প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা নিরাপদ যাত্রা। কিন্তু যদি মহাসড়কে প্রতিটি যাত্রাই জীবনসংকটের সমার্থক হয়ে ওঠে, তবে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থারও গভীর সংকট তৈরি করবে।