ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ধর্ষণ রোধে প্রয়োজন কঠোর আইন ও প্রয়োগ

অদ্রিতা দাস, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: জুন ১, ২০২৬, ১১:৪৯ পিএম

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী এবং ৪৯ শতাংশ পুরুষ। যেই দেশে নারীরা জনসংখ্যার অর্ধেকরও বেশি, সেখানেই তারা সবচেয়ে বেশি অনিরাপত্তা, সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার। প্রতিবার কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে আমাদের সমাজে ক্ষোভের ঝড় নামে, আর প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় কঠোর বিচারের আশ্বাস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়। এরপর আবার নতুন কোনো ঘটনা ঘটে, আবার আমরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠি। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের কয়টি ঘটনার আমরা সত্যিকার ও সুষ্ঠু বিচার হতে দেখেছি? বারবার ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা প্রমাণ করে নারীর নিরাপত্তা আজও বড় এক ধরনের অনিশ্চয়তার নাম। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি শুধু একজন ভুক্তভোগীকেই নয়, পুরো সমাজকেই ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বর্তমানে নারী এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বছরের প্রথম সাড়ে ৪ মাসেই সারা দেশে ২ হাজারেরও বেশি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে, অথচ এর বেশিরভাগেরই তদন্ত কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এর দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ৫,৯৪২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। শুধু শিশু নয়, তরুণী থেকে শুরু করে বৃদ্ধারাও আজ ধর্ষকদের কুনজর থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো এদেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে মামলা আদালতে গেলেও ট্রাইব্যুনালে রায়ের পর উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে ভুক্তভোগীরা ন্যয়বিচার পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার শিকার হন, আর অপরাধীরা পেয়ে যায় নতুন অপরাধ করার সাহস।

সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো পুরো দেশকে আতঙ্কিত ও শোকাহত করে তুলেছে। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার মতো নৃসংশ ঘটনা ঘটছে যা আমাদের সমাজের মানবিক মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ছোট্ট শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরে তার নিথর মরদেহ উদ্ধার করা হয় প্রতিবেশীর ঘর থেকে। ফরিদপুরের বাখুন্ডা আশ্রায়ণ প্রকল্পে চকোলেটের প্রলোভন দেখিয়ে এক শিশুকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় এবং পরে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ সেপটিক ট্যাংকে লুকিয়ে রাখা হয়। চট্টগ্রামে ৩ বছর বয়সি এক কন্যাশিশুসহ আরও এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনা দেশবাসীকে হতবাক করে দেয়। এ ছাড়া সীতাকু-ে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মতো পাশবিক ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে মাগুরায় নিজ বাড়িতে এক আত্মীয়ের হাতে মাত্র ৮ বছরের এক শিশু নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে চিকাৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। এসব ঘটনা বাংলাদেশের বিচার

ধর্ষণ শুধু শারীরিক সহিংসতা নয়, এটি একটি বিকৃত মানসিকতার বহির্প্রকাশ। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ষণের পেছনে শুধু যৌন আকাক্সক্ষা কাজ করে না; বরং আধিপত্য বিস্তার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা যায়, ধর্ষকদের মধ্যে অতিরিক্ত আগ্রাসী মনোভাব থাকে, যা তারা অপরাধের মাধ্যমে প্রকাশ করে। অধিকাংশ অপরাধীর মূল উদ্দেশ্য থাকে ভিকটিমের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তারা নারীদের অধিনস্থ মনে করে আনন্দ পায় এবং তাদের দমন করার মাধ্যমে নিজেদের পুরুষত্ব প্রমাণ করতে চায়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধ করার পরও তারা নিজেদের দায় স্বীকার না করে ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা কিংবা আচরণকে দায়ী করার চেষ্টা করে। কিন্তু একজন অপরাধী জন্ম থেকে অপরাধী হয়ে বেড়ে ওঠে না। প্রশ্ন এখানেই যে, সমাজের কিছু পুরুষ কেন নারীকে অসম্মানের চোখে দেখে? কেন তারা কন্যাশিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা পর্যন্ত সকলকে কেবল ভোগ্যপণ্য মনে করে?

ধর্ষণের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলোÑ ঊাড়ষঁঃরড়হধৎু ঞযবড়ৎু এবং ঝড়পরধষ ঞযবড়ৎু. ঊাড়ষঁঃরড়হধৎু ঞযবড়ৎু অনুযায়ী, কিছু গবেষক মনে করেন পুরুষের জৈবিক প্রবৃত্তি ও আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা ধর্ষণের মতো অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই তত্ত্বে বলা হয় ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা থেকেই কিছু পুরুষ সহিংস আচরণের দিকে ঝুকে পড়ে। তবে এই তত্ত্বকে অনেক বিশেষজ্ঞ বিতর্কিতও মনে করেন। কেননা কোনো জৈবিক প্রবৃত্তি অপরাধকে বৈধতা দিতে পারে না।

অন্যদিকে, ঝড়পরধষ ঃযবড়ৎু ধর্ষণকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, অশিক্ষা, সহিংস পরিবেশ এবং বিচারহীন সংস্কৃতি একজন মানুষকে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। যখন একটি সমাজে নারীদের অন্যের অধীন হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করেও অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে, তখন ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ আরও বৃদ্ধি পায়। শুধু নিজেদের জৈবিক আগ্রহ মেটাতেই নয়, অনেক সময় সবল কোনো গোষ্ঠী নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য অন্য কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। যা আমরা বিশ্বে ঘটে যাওয়া বড় বড় যুদ্ধের সময় ঘটতে দেখি। কিন্তু সবসময় মেয়েরাই কেন? মেয়ে হয়ে জন্মানো কি আসলেই পাপ?

বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হলো মৃত্যদ- বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- ও অতিরিক্ত অর্থদ-। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত) অনুযায়ী এই বিচার পরিচালিত হয়। এ ছাড়াও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, আইনের কঠোরতা থাকলেও এর সঠিক প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। অধিকাংশ মামলার তদন্ত দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহে অবহেলা দেখা যায় এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। অনেক সময় সামাজিক চাপ, ভয়ভীতি ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণেও সুষ্ঠু বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে অপরাধীরা সহজে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় এবং সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ কখনোই শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তাই এই অপরাধ রোধে শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই হবে না সেই আইনের দ্রুত এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে নারীর প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে ওঠে তখনই যখন সেখানে নারী ও শিশুরা ভয় নয়, বরং সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে।