ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রামিসারা ঝরে পড়ে, আমরা ঘুমিয়ে পড়ি

সনেট দেব, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: জুন ৩, ২০২৬, ০৬:০৫ এএম

রামিসা। সাত বছর বয়স। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। হয়তো প্রতিদিন স্কুলব্যাগ গুছিয়ে রাখত। হয়তো মায়ের আঁচল ধরে ঘুমাত। হয়তো স্বপ্ন দেখত বড় হয়ে কী হবে। একটা ছোট মেয়েÑ ফুটফুটে, নিষ্পাপ, এই পৃথিবীতে সবে পা রাখতে শিখেছে। কিন্তু সেই পৃথিবী তাকে বাঁচতে দেয়নি। ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটে সোহেল রানাÑ একজন প্রাপ্তবয়স্ক, বিবাহিত পুরুষ, রামিসাকে ধর্ষণ করে। তারপর গলা কেটে হত্যা করে। লাশ গুম করতে মরদেহ খ-বিখ- করার চেষ্টা করে। এই বাক্যগুলো লিখতে হাত কাঁপে। পড়তে গেলে বুক ভেঙে যায়। কিন্তু এই সত্যটুকু থেকে চোখ সরানোর সুযোগ নেইÑ কারণ এই সত্যই আমাদের বলে দেয় আমরা কোন সমাজে বাস করছি।

রামিসার বাবা গণমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না।’ এই কথাটি কেবল একজন শোকার্ত বাবার কথা নয়। এটি কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর। এটি সেই মানুষগুলোর কথা, যারা বছরের পর বছর ন্যায়বিচার চেয়ে দরজায় দরজায় ঘুরেছেন এবং খালি হাতে ফিরে এসেছেন। এটি সেই মায়েদের কথা, যাদের মেয়েদের নাম মামলার ফাইলে পড়ে আছে, কিন্তু অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণা বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পায়। একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে লাগে তিন বছর সাত মাস। এই সংখ্যাগুলো পড়ে রামিসার বাবার কথার গভীরতা বোঝা যায়। তিনি মিথ্যা বলেননি। তিনি অবিশ্বাস করেননিÑ বরং যথার্থই বিচার করেছেন এই বিচারব্যবস্থাকে।

রামিসা কি প্রথম? না। রামিসা প্রথম নয়। ইয়াসমিন ছিলÑ ১৯৯৫ সালে। দিনাজপুরে পুলিশের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার। তিন পুলিশ সদস্যের ফাঁসি হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র কি সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছিল? না। তনু ছিলÑ ২০১৬ সালে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার। বছরের পর বছর পার হয়ে গেছে, বিচার আজও হয়নি। আছিয়া ছিল, পুতুল ছিল, মাগুরার আট বছরের শিশু ছিল। এবং এখন রামিসা। চলতি বছরের মাত্র প্রথম সাড়ে চার মাসে (জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত) ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ শিশুকে। মাত্র ২০ দিনে পাঁচটি কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা। প্রতিটি নাম একটি জীবন। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রাষ্ট্রের একটি ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে।

ধর্ষণ মানে একটি মানুষের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। ধর্ষণ মানে একটি পরিবারকে চিরতরে ভেঙে দেওয়া। ধর্ষণ মানে সমাজে বলে দেওয়া যে নারী ও শিশুর কোনো নিরাপত্তা নেই। একজন লেখক বলেছিলেন, রামিসাকে, পুতুলকে, আছিয়াকে ধর্ষণ করা মানে রাষ্ট্রকেই ধর্ষণ করা। কারণ রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় জনগণ একটি অপরিহার্য উপাদান। সেই জনগণের একজন শিশুকন্যা যখন নিজের ঘরের পাশে নিরাপদ নয়, তখন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অর্থটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ নারীÑ অর্থাৎ প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনÑ তাদের জীবদ্দশায় কোনো না কোনো নির্যাতনের শিকার হন। বিবাহিত নারীদের ৫০ থেকে ৫৪ শতাংশ স্বামীর দ্বারা শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার, যা বিশ্ব গড়ের (৩০ শতাংশ) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই সংখ্যাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে একটাই প্রশ্ন মাথায় আসেÑ আমরা কি সত্যিই একটি সভ্য রাষ্ট্র?

প্রতিটি বড় ঘটনার পর একই দাবি ওঠেÑ আইন কঠোর কর, মৃত্যুদ- দাও, দ্রুত বিচার কর। এ দাবিগুলো অযৌক্তিক নয়। কিন্তু এগুলোই কি যথেষ্ট? বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-। তবু প্রতিদিন গড়ে ১৩ জনের বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এটাই বলে দেয় যে কেবল আইনের কঠোরতা অপরাধ কমায় না। অপরাধীকে থামায় বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা। আর সেই নিশ্চয়তা যখন মাত্র ৩ শতাংশ, তখন সর্বোচ্চ শাস্তিও কাগুজে বাঘের মতোই থেকে যায়। ইতালিতে ২০২৩ সালে একটি হত্যাকা-ের পর সারা দেশে আন্দোলন হয়েছিল। সরকার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলে ‘নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা’ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিল। সমাজকে পরিবর্তন করার উদ্যোগ নিয়েছিল। বাংলাদেশে ১৯৯৫ থেকে ২০২৬Ñ তিন দশক পেরিয়ে গেছে। সরকার বদলেছে, কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের কোনো সংগঠিত উদ্যোগ দেখা যায়নি। স্পেনের অ্যাটর্নি জেনারেল তার প্রতিবেদনে বলেছেন, পর্যাপ্ত যৌনশিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবই কিশোরদের মধ্যে বিকৃত যৌন আচরণ তৈরি করছে। আমাদের দেশে এই বিষয়টি এখনো ট্যাবু। পরিবারে আলোচনা হয় না, স্কুলে পড়ানো হয় না। ফলে একটি শিশু যৌনতা সম্পর্কে যা জানে, তার বেশিরভাগ আসে অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট থেকেÑ বিকৃত পর্নোগ্রাফি থেকে।

নারী নির্যাতনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। পাকিস্তানের তুলনায় অপরাধের হার প্রায় তিনগুণ বেশি। ঢাকা বিভাগে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা পুরো স্পেনের তুলনায় বেশি। এ তথ্যগুলো পড়ে লজ্জা লাগে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যা লাগে তা হলো ভয়Ñ কারণ এই তথ্যগুলো বলছে, আমাদের দেশে কোনো মেয়েশিশুই নিরাপদ নয়। না ঘরে, না বাইরে, না স্কুলে, না মাদ্রাসায়, না প্রতিবেশীর কাছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘের তথ্য বলছে, ৫১ শতাংশেরও বেশি নারী জানেন না নির্যাতনের শিকার হলে কোথায় যেতে হবে। মাত্র ৬ শতাংশ নারী অভিযোগ করেন। বাকিরা চুপ থাকেনÑ সমাজের ভয়ে, পরিবারের ভয়ে, ‘সম্মান’ রক্ষার ভয়ে। অর্থাৎ আমরা যে পরিসংখ্যান দেখছি, সেটা আসল চিত্রের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। প্রকৃত নির্যাতনের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক, অনেক বেশি।

প্রতিটি বড় ঘটনার পর মন্ত্রী বলেন, দ্রুত বিচার হবে। পুলিশ বলে, তদন্ত চলছে। সংসদে বক্তৃতা হয়। গণমাধ্যমে বিবৃতি আসে। তারপর নতুন একটি ঘটনা ঘটে, নতুন চক্র শুরু হয়। ২০২০ সালে নারী নির্যাতনের হার বেড়ে যাওয়ার পর জাতীয় ইনকোয়ারি কমিটি গঠিত হয়েছিল। ২০২১ সালের জুনে বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট ও আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা হয়েছিল। সেই সভায় করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তারপর? কিছুই না। সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।

শুধু রাষ্ট্রের প্রশ্ন নয়, আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করার সময় এসেছে। আমরা কি আমাদের ছেলে-সন্তানদের শেখাচ্ছি যে মেয়েরাও সমান মানুষ? আমরা কি পরিবারে কন্যার মতোই পুত্রকেও নারীর প্রতি শ্রদ্ধা শেখাচ্ছি? আমরা কি প্রতিবেশীর বাড়িতে সন্দেহজনক কিছু দেখলে এগিয়ে আসি? আমরা কি একটি নির্যাতিত নারীকে সাহায্য করতে গিয়ে তাকে উল্টো ‘চরিত্রহীন’ বলে ঘরে ফিরে আসি? একটি সমাজ তখনই পরিবর্তন হয়, যখন প্রতিটি মানুষ নিজের জায়গা থেকে পরিবর্তনের অংশ হয়। রাষ্ট্র যদি ব্যর্থও হয়, সমাজ যদি জেগে ওঠে, তাহলেও অনেকটা পথ এগানো যায়।

মাগুরার শিশুটির ক্ষেত্রে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত বিচারের অঙ্গীকার করেছিল এবং নিম্ন আদালতে স্বল্প সময়ে মামলাটি নিষ্পত্তি হয়েছে। এটি ইতিবাচক। কিন্তু এই ‘বাছাই করা’ বিচার একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয়। যেসব মামলা ভাইরাল হয়, সেগুলোর বিচার হয়; বাকি হাজারো মামলা ধুলায় পড়ে থাকে। ন্যায়বিচার হতে হবে সবার জন্য। রামিসার মতো যে শিশুর নাম গণমাধ্যমে এসেছেÑ তার জন্যও, এবং যার নাম কেউ জানে নাÑ তার জন্যও।

রামিসা আর নেই। তার ফুটফুটে মুখ, তার স্কুলব্যাগ, তার ভবিষ্যৎÑ সব শেষ হয়ে গেছে একটি পাশবিক মুহূর্তে। কিন্তু রামিসার মৃত্যু যদি এই দেশে কিছু একটা বদলাতে পারেÑ যদি এই বেদনা রাষ্ট্রকে জাগায়, সমাজকে নাড়া দেয়, প্রতিটি মানুষকে একটু সচেতন করেÑ তাহলেই কেবল তার মৃত্যু অর্থহীন হবে না। আমরা রামিসাকে কথা দিতে পারি না যে আর কোনো শিশু এভাবে চলে যাবে না। কিন্তু আমরা প্রতিশ্রুতি দিতে পারি যে আমাদের চেষ্টা থামাব না। দ্রুত বিচার চাই। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান চাই। সামাজিক শিক্ষার বিস্তার চাই। এবং সবচেয়ে বেশি চাইÑ একটি রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র তার নারী ও শিশুকে আগলে রাখে, লাশ হওয়ার পরে নয়, বেঁচে থাকার সময়ে। রামিসার মতো শিশুরা এই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের রক্ষা করা মানে এই দেশকে রক্ষা করা। শুধু এটুকু বুঝলেইÑ হয়তো বদলাবে এই বাংলাদেশ।