উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বড় স্বপ্ন আর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থাকা স্বাভাবিক, তবে তা হতে হবে বাস্তবোচিত। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটটি একদিকে যেমন ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের অংশ, অন্যদিকে এটি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এক কঠিন পরীক্ষা। সরকার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৬ শতাংশ ধরলেও বিশ্বব্যাংকসহ অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস এর চেয়ে অনেক কম। এই বিশাল ব্যয়ের বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার যে রাজস্ব আদায়ের পাহাড়সম লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তির চেয়ে বেশি অস্বস্তি তৈরি করতে পারে বলে জনমনে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাজেটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য নির্ধারিত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল লক্ষ্যমাত্রা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই যেখানে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নতুন অর্থবছরে আরও ১ লাখ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের পরিকল্পনা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়। রাজস্ব বাড়াতে সরকার এবার ছোট ব্যবসায়ী ও নন-ট্যাক্স উৎসের ওপর জোর দিয়েছে। ৫০ লাখ টাকা বার্ষিক লেনদেনকারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর ন্যূনতম ভ্যাট আরোপ এবং ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, বর্তমানে নিবন্ধিত ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশই নিয়মিত ভ্যাট দেয় না। ফলে করের আওতা না বাড়িয়ে করের হার বাড়ানো বা সেবামূলক খাত থেকে অতিরিক্ত নন-ট্যাক্স রাজস্ব (যেমন : পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, টোল বা প্রশাসনিক ফি বৃদ্ধি) আদায়ের চেষ্টা শেষ বিচারে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ নাগরিকের পকেটই খালি করবে।
তবে এই বাজেটে আমজনতার জন্যও রয়েছে বেশ কিছু স্বস্তিদায়ক ঘোষণা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই দমবন্ধ সময়ে সরকার গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে খেজুর ও বিভিন্ন মসলার রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং শিশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। সবচেয়ে বড় স্বস্তি এসেছে স্বাস্থ্য খাতে; হার্টের রিং, কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দেশের লাখ লাখ রোগীর চিকিৎসা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে। এছাড়া ল্যাপটপ, কম্পিউটারসহ প্রযুক্তিপণ্যে করছাড় তরুণ ফ্রিল্যান্সার ও শিক্ষার্থীদের জন্য এক বড় উপহার। পাশাপাশি কৃষি খাতে সার ও কীটনাশকের কাঁচামালে ভ্যাট মওকুফ দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে মজবুত করবে।
তবে মুদ্রার দুই পিঠের বৈপরীত্যই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কাগজের এই জনবান্ধব সুবিধাগুলো বাস্তবে রূপ নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদেরা সন্দিহান। অতীতে দেখা গেছে, শুল্ক কমলেও কার্যকর বাজার তদারকির অভাবে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পুরো মুনাফা নিজেদের পকেটে তোলে, যার সুবিধা সাধারণ ভোক্তা পান না। অন্যদিকে, বড় বাজেট বাস্তবায়নে সরকার যদি রাজস্বের চাপ সাধারণ মানুষের ওপর দেয়, তাহলে স্বাস্থ্য বা প্রযুক্তিতে পাওয়া ছাড়ের আনন্দ মূল্যস্ফীতি আর করের বোঝায় ঢাকা পড়ে যাবে।
এক অর্থে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আশা ও আশঙ্কার এক জটিল সমীকরণ। সাধারণ মানুষ শুধু বাজেটের দীর্ঘ তালিকায় বা অর্থমন্ত্রীর আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে চান না; তারা বাজারে চাল-ডাল-তেলের দাম কমছে দেখতে চান, চিকিৎসার প্রকৃত খরচ কমছে দেখতে চান। এই উচ্চাভিলাষী বাজেটের সাফল্য তাই কোনো তাত্ত্বিক সংখ্যার মারপ্যাঁচে নয়, বরং এর শতভাগ সৎ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন