× UCB Sticker Card
শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

কাজী আহমেদ শামীম, লেখক ও বিশ্লেষক

প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ১২:০৭ এএম

‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’ : মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে কি নতুন ভোরের সূচনা করবে?

কাজী আহমেদ শামীম, লেখক ও বিশ্লেষক

প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ১২:০৭ এএম

‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’ : মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে কি নতুন ভোরের সূচনা করবে?

গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যে কয়টি দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে ফেলেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ ও ছায়াযুদ্ধ (চৎড়ীু ডধৎ)। নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে টানাপোড়েন এবং ওমান সাগর বা পারস্য উপসাগরে সামরিক মহড়ার মধ্য দিয়ে এই দুই দেশের সম্পর্ক সবসময়ই বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থায় ছিল। তবে সম্প্রতি, সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের প্রতিনিধিদের গোপন বৈঠকের পর যে ‘১৪ দফা সমঝোতা স্মারক’ (গড়ট) প্রকাশ্যে এসেছে, তা বিশ্ববাসীকে একাধারে চমকে দিয়েছে এবং আশাবাদী করে তুলেছে। ১৭ জুন মার্কিন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’-এর বিষয়বস্তু প্রকাশ করার পর থেকেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই চুক্তি কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেবে, নাকি এটি সাময়িক কৌশলগত যুদ্ধবিরতি মাত্র?

পটভূমি ও সমঝোতার অন্তর্নিহিত বার্তা

দীর্ঘদিন ধরে চলা অচলাবস্থা ভাঙার পেছনে দুই দেশেরই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা কাজ করেছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান সংকট এবং এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বেশি মনোযোগ দিতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি কাদা-ছোড়াছুড়ি থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অন্যদিকে, বছরের পর বছর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের মুখে থাকা ইরানের জন্য এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

আগামী ১৯ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া এই ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলোÑ এটি কেবল পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পরিধি লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের সামরিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে স্পর্শ করেছে। হোয়াইট হাউস এটিকে একটি সাধারণ ‘রাজনৈতিক দলিল’ বলে এর গুরুত্ব কিছুটা আড়াল করার চেষ্টা করলেও, নথির গভীরতা বলছে ভিন্ন কথা।

সামরিক অভিযান বন্ধ এবং আঞ্চলিক অখ-তার স্বীকৃতি

সমঝোতার প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় সাফ বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের সমর্থিত কোনো পক্ষ বা মিত্ররা লেবাননসহ কোনো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাবে না। এই ধারাটি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক বছর ধরে চলা ছায়াযুদ্ধের তীব্রতা এক ধাক্কায় বহুলাংশে কমে আসবে। ইয়েমেনের হুথি, লেবাননের হিজবুল্লাহ কিংবা সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর তেহরানের যে প্রভাব রয়েছে, তা ওয়াশিংটন ভালো করেই জানে। চুক্তি অনুযায়ী যদি ইরান তার মিত্রদের শান্ত রাখতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি তার সামরিক আগ্রাসন বা গোপন অভিযান থেকে বিরত থাকে, তবে তা হবে চলতি দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার এই অঙ্গীকার যদি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নতুন এক নজির স্থাপন করবে।

হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক জ¦ালানি অর্থনীতির স্বস্তি

বিশ্বের মোট খনিজ তেলের এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয় পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে। বিগত দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সামান্যতম উত্তেজনাতেই এই জলপথ অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হতো, যার সরাসরি প্রভাব পড়ত বৈশ্বিক তেলের বাজারে এবং ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ত।

সমঝোতার চতুর্থ ও পঞ্চম দফা অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকরের মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নৌ অবরোধ তুলে নেবে। বিনিময়ে ইরান ওমান সাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে এবং হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেবে। এই পদক্ষেপটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বিশাল লাইফলাইন। সমুদ্রপথে বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ¦ালানি তেলের দাম স্থিতিশীল হবে, যা যুদ্ধ-বিগ্রহের এই যুগে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখবে।

৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল

এই চুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং সমালোচিত দিকটি হলো ইরানের পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক সহযোগীদের অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি। এটিকে অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক নতুন ‘মার্শাল প্ল্যান’ হিসেবে দেখছেন। বছরের পর বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরানের ব্যাংকিং, তেল রপ্তানি ও বিমা খাতকে এই চুক্তির মাধ্যমে ধাপে ধাপে ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (ওঅঊঅ) নিষেধাজ্ঞাগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইরানের জব্দ করা কোটি কোটি ডলারের তহবিল ধাপে ধাপে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত তেহরানের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, মার্কিন কংগ্রেস বা ওয়াশিংটনের কট্টরপন্থি লবিস্টরা তেহরানকে এত বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিকে কীভাবে গ্রহণ করবে?

পারমাণবিক অস্ত্র বিতর্ক ও আইএইএ-এর ভূমিকা

চুক্তির ৮ম ও ৯ম দফায় ইরান পুনরায় স্পষ্ট করেছে যে, তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচিকে স্থিতাবস্থায় (ঝঃধঃঁং ছঁড়) রাখবে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং এই অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন থেকে বিরত থাকবে।

এটি ওবামা আমলের সেই ঐতিহাসিক ২০১৫ সালের ‘জেসিপিওএ’ (ঔঈচঙঅ) বা ইরান পারমাণবিক চুক্তির কথাই মনে করিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসন একতরফাভাবে বাতিল করেছিল। এবারের সমঝোতাটির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে এটিকে অনুমোদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা চুক্তিটিকে আইনিভাবে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেবে।

চ্যালেঞ্জ যেখানে : ৬০ দিনের কঠিন অগ্নিপরীক্ষা

সমঝোতা স্মারকটি সই হওয়ার পর চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষ ৬০ দিন সময় পাবে। এই দুই মাস সময় হবে কূটনীতির আসল অগ্নিপরীক্ষা। ইতিহাস সাক্ষী, এই ধরনের সমঝোতা যত সহজে কাগজে লেখা যায়, বাস্তবে রূপ দেওয়া ততটাই কঠিন। বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েল এই চুক্তিকে কীভাবে দেখবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। ইসরায়েল সবসময়ই ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনে বাধা দিতে প্রয়োজনে একতরফা সামরিক হামলার হুমকি দিয়ে এসেছে। ওয়াশিংটনের এই নীতি পরিবর্তন তেল আবিবকে ক্ষুব্ধ করতে পারে। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচন বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে কট্টরপন্থিরা এই চুক্তিকে ‘ইরানের সামনে আত্মসমর্পণ’ বলে অ্যাখ্যা দিতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা শত্রুতা মাত্র ৬০ দিনে দূর করা সম্ভব নয়। যেকোনো এক পক্ষের সামান্য বিচ্যুতি বা কোনো ছায়াগোষ্ঠীর একটি মাত্র রকেট হামলা পুরো প্রক্রিয়াটিকে ভেস্তে দিতে পারে।

শেষ কথা

হোয়াইট হাউস ঠিকই বলেছে, এটি হয়তো দুই দেশের সব গোপন বোঝাপড়ার পূর্ণ প্রতিফলন নয়। পর্দার আড়ালে হয়তো আরও অনেক ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বিশ্ববাসীকে এই বার্তা দেয় যেÑ সবচেয়ে কঠিন শত্রুতাও আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান করা সম্ভব।

যদি আগামী দুই মাসে এই সমঝোতা একটি পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই চুক্তিতে রূপ নেয়, তবে তা কেবল মার্কিন-ইরান সম্পর্কের বরফই গলাবে না, বরং ইয়েমেন, সিরিয়া ও লেবাননে চলমান মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধানের পথ প্রশস্ত করবে। যুদ্ধ আর ধ্বংসের বৃত্তে বন্দি মধ্যপ্রাচ্য কি তবে এক নতুন ভোরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে? উত্তর লুকিয়ে আছে আগামী ৬০ দিনের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের ওপর।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!