রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার আজ আর বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য বাস্তবতা। বিশেষ করে রাজধানীর গুলশান-বনানীর মতো কূটনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আধুনিক সিসিটিভি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি এবং সমন্বিত কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থাই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে উদ্বেগের কারণও হয়ে ওঠে বহুগুণ।
রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন গুলশান-বনানী এলাকার সিসিটিভি ও এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রবেশাধিকার নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের পরও এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও টেন্ডারসংক্রান্ত অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান চলমান বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাই। তবে অভিযোগগুলো যে জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, অতীতে সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস হওয়ার ঘটনা। যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অনুমোদনহীনভাবে নজরদারি ব্যবস্থায় প্রবেশ করে ভিডিও সংগ্রহ ও প্রচার করতে সক্ষম হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন নয় বরং পুরো নিরাপত্তা অবকাঠামোর দুর্বলতার ইঙ্গিত। এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নজরদারি প্রযুক্তির মূল শক্তি শুধু ক্যামেরার সংখ্যা হতে পারে না, সেই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশাধিকার, তথ্য সংরক্ষণ এবং সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। একটি আধুনিক সিসিটিভি নেটওয়ার্কে কারা প্রশাসনিক প্রবেশাধিকার পাচ্ছে, ভিডিও কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, সফটওয়্যার কতটা নিরাপদ এবং কত ঘনঘন নিরাপত্তা পরীক্ষা হচ্ছে, এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না থাকলে পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হলেও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষ করে এআইভিত্তিক ফেসিয়াল রিকগনিশন ও বৃহৎ পরিসরের ভিডিও নজরদারির ক্ষেত্রে এখনো সুস্পষ্ট আইনি ও নীতিগত কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। কোনো রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থাই জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না।
যদি কোনো প্রকল্পে টেন্ডার প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নির্বাচন বা দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন থেকে থাকে, তাহলে সেসব বিষয়ে স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক নিরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নজরদারি ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক ও সাইবার নিরাপত্তা অডিট পরিচালনা করে নিশ্চিত করতে হবে, কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এখনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার কিংবা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার ধরে রাখেনি।
গুলশান-বনানী শুধু একটি আবাসিক এলাকা নয়, এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক নিরাপত্তার অন্যতম কেন্দ্র। এখানে বিদেশি দূতাবাস, আন্তর্জাতিক সংস্থা, শীর্ষ ব্যবসায়ী, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও রাষ্ট্রীয় অতিথিদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। ফলে এই এলাকার নিরাপত্তা অবকাঠামো নিয়ে সামান্যতম সন্দেহও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত হতে পারে।
সরকারের উচিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, চলমান প্রকল্পগুলোর প্রযুক্তিগত ও আর্থিক নিরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সব প্রবেশাধিকার পুনর্মূল্যায়ন করা। পাশাপাশি সিসিটিভি ও এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার জন্য একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি নাগরিকের গোপনীয়তা ও সাংবিধানিক অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।
প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, তার ওপর রাষ্ট্রের দায়িত্বও তত বাড়বে। নিরাপত্তার নামে কোনো অনিশ্চয়তা, অস্বচ্ছতা বা নিয়ন্ত্রণহীনতা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসের কোনো অবকাশ নেই; প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব।

