× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আফিয়া আবিদা এষা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৬:৫১ এএম

মেধাশূন্যতার চোরাবালিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

আফিয়া আবিদা এষা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৬:৫১ এএম

মেধাশূন্যতার চোরাবালিতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার খনিজ, প্রাকৃতিক সম্পদ বা অবকাঠামো নয়; বরং তার মেধাবী মানবসম্পদ। অথচ অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিভাবান তরুণদের মধ্যে দেশ ছাড়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে না হতেই বহু মেধাবী তরুণ পাড়ি জমাচ্ছেন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে। সংবাদমাধ্যমের ভাষায় একে বলা হয় ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচার। কিন্তু এই শব্দবন্ধের আড়ালে যে গভীর জাতীয় ক্ষতি লুকিয়ে আছে, তা কেবল একটি পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি আসলে একটি রাষ্ট্রের মেধার রক্তক্ষরণ। যে তরুণদের দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল, তারা আজ অন্য দেশের উন্নয়ন ও জিডিপি বৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন। আর বাংলাদেশ হারাচ্ছে তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদÑ মেধাবী মানুষ।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, তরুণরা কেন দেশ ছাড়ছেন? তবে কি দেশপ্রেমের অভাব? বাস্তবতা হলো, সমস্যাটি দেশপ্রেমের নয়; বরং দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের। একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ চার-পাঁচ বছর কঠোর পরিশ্রম করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পর আশা করেন, তার মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগে স্বচ্ছতার ঘাটতি, তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম কিংবা প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনাগুলো মেধার মূল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে অনেক ক্ষেত্রে বেতন, কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত নিরাপত্তা বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে হতাশা থেকেই জন্ম নেয় দেশ ছাড়ার প্রবল আকাক্সক্ষা।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলোÑ গবেষণা, উদ্ভাবন ও চিন্তার স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশের অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সীমিত গবেষণা বাজেট এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে আবদ্ধ। গবেষণাগার, আধুনিক প্রযুক্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা-সুবিধার অভাব একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীল বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক তরুণ গবেষক অনুভব করেন, যোগ্যতার তুলনায় তোষামোদ বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মূল্য বেশি। ফলে তারা এমন দেশে পাড়ি জমান, যেখানে গবেষণার স্বাধীনতা, উন্নত অবকাঠামো এবং মেধার যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা ও তীব্র প্রতিযোগিতা অনেক শিক্ষার্থীর মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বিদেশে তুলনামূলক স্থিতিশীল ক্যারিয়ার ও উন্নত গবেষণার সুযোগ তাদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

মেধা পাচারের আরেকটি দিক হলোÑ দক্ষ মানবসম্পদের অপব্যবহার। আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, যাদের প্রকৌশল, বিজ্ঞান বা গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা, তাদের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ক্যারিয়ারের প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন। ব্যক্তিগত পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা অবশ্যই রয়েছে, তবে যখন গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ধারাবাহিকভাবে অন্য খাতে সরে যায়, তখন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলো দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই মেধা পাচারের মূল্য রাষ্ট্রকে বহুমাত্রিকভাবে পরিশোধ করতে হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্প, তথ্যপ্রযুক্তি খাত কিংবা বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবায় বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। যে কাজ দক্ষ দেশীয় জনবল করতে পারত, সেই কাজের জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ শিক্ষক ও গবেষকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে একটি আত্মঘাতী চক্র, ভালো শিক্ষক ও গবেষকের অভাবে শিক্ষার মান কমছে, আর শিক্ষার মান কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্ম আরও বেশি করে বিদেশমুখী হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু দেশের সেরা মেধাবীরা যদি ধারাবাহিকভাবে বিদেশে স্থায়ী হয়ে যান, তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। মেধা পাচার রোধ করতে হলে কেবল আবেগ বা দেশপ্রেমের আহ্বান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতিগত উদ্যোগ। চাকরির বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, নিয়োগে মেধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, গবেষণা ও উদ্ভাবনে জাতীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তিনির্ভর তদবির ও অস্বচ্ছ নিয়োগ সংস্কৃতির অবসান ঘটানো জরুরি।

মেধাবীরা যখন দেশ ছাড়েন, তারা শুধু একটি পাসপোর্ট বা লাগেজ নিয়ে যান না; সঙ্গে করে নিয়ে যান বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অসংখ্য সম্ভাবনা। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে যোগ্য মানুষ সম্মান, নিরাপত্তা ও কাজের যথাযথ মূল্যায়ন পাবেন। কারণ একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল সেতু, মহাসড়ক বা অট্টালিকা নির্মাণে নয়; বরং তার মেধাবী মানুষদের ধরে রাখার সক্ষমতায় নিহিত।

আজ যদি আমরা আমাদের তরুণদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকলেও জ্ঞান, উদ্ভাবন ও নেতৃত্বে পিছিয়ে পড়বে। আর সেই ক্ষতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হবে আগামী প্রজন্মকেই।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!