× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

‎এস এম নাহিদ হাসান

প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ০৩:৪২ এএম

শিক্ষার্থীদের বদলে যাওয়া জীবন ও আমাদের সামাজিক ঝুঁকি

‎এস এম নাহিদ হাসান

প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ০৩:৪২ এএম

শিক্ষার্থীদের বদলে যাওয়া জীবন ও আমাদের সামাজিক ঝুঁকি

খুব বেশি আগের কথা নয়Ñ এই ২০-২৫ বছর আগের কথা। সে সময়ের শিক্ষার্থীদের জীবন ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়মতান্ত্রিক। প্রায় সব ছাত্রের রুটিন ছিল অনেকটা একই রকম। ছাত্ররা সকালে ঘুম থেকে উঠে হয় তারা প্রাইভেট টিউশনিতে ছুটত নয়তো বাসায় বসে যেত পড়ার টেবিলে। এরপরে খাওয়া-দাওয়া করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়া। জোহরের নামাজের পর আসরের নামাজের আগে তারা বাসায় ফিরত। এরপরে খাওয়া-দাওয়া করেই ছেলেরা চলে যেত খেলার মাঠে আর মেয়েরা বাড়ির আশপাশের খেলার সাথীদের সঙ্গে গল্পগুজব আর খেলাধুলো করত। মাগরিবের নামাজের আজান শেষ হওয়ার পূর্বে ফিরতে হতো বাড়িতে। এরপরে সন্ধ্যার পরে কিছু একটা খেয়েই পড়তে বসা, একপর্যায়ে রাতের খাবার খাওয়া। কোনো কোনো দিন টেলিভিশনে শিক্ষামূলক বা প্রযোজ্য কোনো বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখা। এরপর ঘুম।

‎পরদিন আবার সকালে জাগা, আবার একই প্রক্রিয়া। এটা শতভাগ না হলেও প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীর ধরাবাঁধা রুটিন ছিল। ব্যত্যয় হতো না কারো কারোÑ এমনটা নয়। কিন্তু যদি ব্যত্যয় হতো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যে ধরনের পারিবারিক চাপ তাদের ওপরে তৈরি হতো, তাতে ওই রুটিন অগ্রাহ্য করার কথা কোনো ছাত্র ভাবতই না।

‎সেই সময়ে চায়ের দোকানে ছাত্র বয়সি কারো বসাটা ভালোভাবে নেওয়া হতো না! আড়চোখে তাকাতেন মুরুব্বিরা। মোড়ে মোড়ে আড্ডা ছিল না বা একদমই চায়ের দোকানে বসা হতো নাÑ এমন কিন্তু নয়। তবে সেটা ছিল অত্যন্ত সীমিত। সে সময়ও ছাত্রদের কেউ কেউ সিগারেট খেত তবে সেটা কখনো কারো নজরে পড়েছে এমনটা বড় একটা দেখা যেত না।

‎‎তখন যে ছাত্ররা গালি দিত না এমনও কিন্তু নয়। দিত, তবে বড় কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া তা কারো নজরে বোধহয় আসত না। তখন রাস্তাঘাটে পরিচিত বা অপরিচিত যাই হোক, বয়সে বড় কাউকে দেখলেই সালাম বিনিময় হতো। সামাজিক নিয়মগুলো এমন ছিল এই কারণে নয় যে, সব ছাত্র সব বৈশিষ্ট্যে ভালো ছিল। বরং এখানে তাদের একটা ভয় কাজ করত। ভয়টা ছিল এমন যে আদব-কায়দা দেখানোর ব্যত্যয় ঘটলে পরিবারে অভিযোগ যেতে পারে, আর গেলে অভিযোগ যাচাইয়ের আগেই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেত!

‎‎আসুন আজকের দিনটা ভাবি। কজন ছাত্র মাগরিবের আজান শেষ হওয়ার আগেই বাড়িতে ফেরে এবং সন্ধ্যার পরে বাড়ির বাইরে যাওয়ার কথা চিন্তাও করে না? কজন ছাত্র আছে যাদের হাতে স্মার্টফোন নেই? এখানে প্রশ্ন আসতে পারে এই যুগে কি স্মার্টফোনের বিকল্প আছে? না নেই। তবে সেই স্মার্টফোনটি অধিকাংশ ছাত্র কি কাজে ব্যবহার করে? বিভিন্ন অনলাইন গেমস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসভ্যতা, অনলাইন জুয়া আর কি কি যে তারা করছে না সেটাই প্রশ্ন। একটি মোবাইল ফোনকে উৎপাদনশীল অনেক কাজে ব্যবহার করা যায়। ইউটিউব দেখে গ্রামের কৃষিকাজ করা ছেলেটাও অবিকল ইংরেজদের মতো উচ্চারণে ইংরেজি বলছে। ইউটিউব ব্যবহার করে কেউ কেউ বানিয়ে ফেলছে অসম্ভব সুন্দর বিজ্ঞানের প্রজেক্ট, কেউ কেউ তো আবার হেলিকপ্টার বানিয়ে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। এগুলো মোবাইল ফোনের আশীর্বাদ। প্রযুক্তির এই ইতিবাচক সম্ভাবনাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু অধিকাংশ ছাত্র মোবাইল ফোন যে কাজে ব্যবহার করছে সেটি তাদের শুধু অবসাদই দিচ্ছে না, বরং অনৈতিকতার চূড়ায় তুলে ধ্বংস করে দিচ্ছে এই দেশের সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে। প্রযুক্তি সমস্যা নয়; সমস্যার মূলে রয়েছে প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ও অসচেতন ব্যবহার।

আর মাদকের কথা নাইবা বললাম। আলোতে স্বভাবজাতভাবেই অপরাধ প্রবণতা কম থাকে, অন্ধকারে থাকে বেশি। সন্ধ্যার পরে বন্ধুদের আড্ডায় ছাত্ররা অসামাজিক, অনৈতিক ও অপরাধপ্রবণ বিষয়গুলোর চর্চা করতে পারেÑ এ বোধ হয় আমরা ভুলেই গিয়েছি! মাদকের ভয়াবহ থাবায় খুন থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধপ্রবণতা কিভাবে বেড়ে গিয়েছে তা প্রতিদিনের সংবাদপত্রে চোখ বোলালেই বোঝা যায়।

‎‎অনেকে বলতে পারেন এই যুগের সঙ্গে সেই যুগ মেলানো যাবে না। আমিও পুরোপুরি একমত। মেলানো যাবে না, কারণ তখন মোবাইল ফোন ছিল না বা আরও অনেক সুবিধা ছিল না যা এখন আছে। তবে এমন কিছু মৌলিক চর্চা আছে যা সবসময়ই মানতে হবে, সময় যতই এগিয়ে যাক বা বিজ্ঞানের যতই অগ্রগতি হোক। তখন বাবা-মা, শিক্ষক বা বয়সে বড় কাউকে শ্রদ্ধা করার ব্যাপারটি ছিল সেটি এখনো থাকা দরকার! এছাড়াও সহনশীলতা, উদারতা, ত্যাগ, ছাত্রদের অধ্যবসায়, সময়ানুবর্তিতাসহ আরও অনেক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

‎‎এবার এইচএসসি পরীক্ষায় যে প্রশ্নগুলো এসেছে সেগুলো কি বইয়ের বাইরে থেকে এসেছে? যদি এসে থাকে তা হলে অভিযোগের জায়গা থাকতে পারে। কিন্তু বইয়ের বাইরে থেকে প্রশ্ন নিশ্চয়ই হয়নি। সামনে আসছে সিলেবাসের কথা। বই-ই তো সিলেবাস! বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রশ্ন কাঠামো পরিবর্তন করা হতে পারে বা বইয়ের অংশবিশেষ পাঠ্য বহির্ভূত করা যেতে পারে। এটা খুবই সাধারণ একটা চর্চা। তবে বইটিই যে সিলেবাসÑ এ ব্যাপারে সন্দেহ থাকা উচিত নয়। সেদিন কোনো এক সাক্ষাৎকারে এক শিক্ষার্থী বলছিল ৫ কিংবা ১০ হাজার বহু নির্বাচনি প্রশ্ন পড়ে তিনটি কমন পেয়েছে। কি অদ্ভুত ব্যাপার! এককথায় উত্তর অথবা বহু নির্বাচনি অর্থাৎ তথ্যভিত্তিক প্রশ্নগুলো মূল বইয়ের প্রতিটি লাইনের মাঝে লুকিয়ে থাকে। মূল বইটা ভালো করে পড়লেই হাজার হাজার বহু নির্বাচনি প্রশ্ন পড়তে হয় না। এই সহজ সত্য কথাটা শিক্ষার্থীরা বোঝে না নাকি শিক্ষকেরা বোঝাতে পারেন না এটা গবেষণার দাবি রাখে!

‎বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন বারবার পীড়া দিচ্ছে। অভিভাবকেরা কি হাল ছেড়ে দিয়েছেন, নাকি তারা কিভাবে গড়ে উঠেছেন তা ভুলে গিয়েছেন? সন্তানকে শুধু একটি স্মার্টফোন কিনে দেওয়া যথেষ্ট নয়; তার ব্যবহার, সময় ব্যবস্থাপনা, মানসিক বিকাশ এবং নৈতিক শিক্ষার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে পরিবারকে। হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটা আমাদের সমাজকে ‘বৃদ্ধ নিবাস’ভিত্তিক সমাজে পরিণত করতে পারে!

‎‎যাহোক আমাদের ছাত্ররা যেভাবে আন্দোলন শিখছে তাতে এই দেশ পরিচালনায় যারা যুক্ত আছেন তারা আর বিপথে যাওয়ার সুযোগ সম্ভবত পাবেন না। তবে সেই আন্দোলন যখন নিজেদের দুর্বলতা ঢেকে, সুবিধা নেওয়ার জন্য যৌক্তিকতা ও অযৌক্তিকতা না বিবেচনা করেই করা হবে এবং যখন শিক্ষার্থীরা ন্যায় আর অন্যায়ের তফাৎ করতে পারবে না, তখন সমাজের বারোটা বেজে যেতে আর সময় লাগবে না!

‎‎সময় বদলাবে, প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে, জীবনযাত্রাও পরিবর্তন হবে। কিন্তু একটি সমাজের শক্তি নির্ভর করে তার মানুষের চরিত্র, মূল্যবোধ এবং দায়িত্ববোধের ওপর। আমরা আর সমাজের অবক্ষয় চাই না, আমরা চাই সমাজটা ভালোভাবে টিকে থাকুক; আমার, আপনার, সবারÑ বাংলাদেশের সমাজ।

 লেখক : শিক্ষক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!