একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কখনোই অপরাধ নয়, বরং তা সমাজের স্পন্দনেরই প্রতিফলন। কিন্তু সেই আন্দোলন যখন দাবি আদায়ের সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার কৌশল, রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ কিংবা গোপন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় সত্য উদ্ঘাটন করা। একই সঙ্গে সরকারেরও আত্মসমালোচনা জরুরি, কোথায় ভুল ছিল, কেন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গড়াল এবং ভবিষ্যতে তা কীভাবে এড়ানো যায়।
বৈরী আবহাওয়া, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের বাস্তব ভিত্তি ছিল। অনেক পরীক্ষার্থী চরম দুর্ভোগের মধ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেছে, কেউ পরীক্ষায় অংশই নিতে পারেনি। প্রশ্নপত্রে ভুল এবং শিক্ষামন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য সেই ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়। সরকার পরে দাবি মেনে নেয়, বিকল্প পরীক্ষার সুযোগ ও ভুল প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার ঘোষণা দেয়। সাধারণত এখানেই আন্দোলনের যৌক্তিক পরিসমাপ্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দাবি পূরণের পরও আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে কেন্দ্র করে কর্মসূচি অব্যাহত থাকে এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বারবার সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ তখন কার হাতে ছিল?
সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, এই আন্দোলনে রাজনৈতিক গোষ্ঠী, নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মী, বহিরাগত এবং বিদেশ থেকে পরিচালিত অপপ্রচারের সংশ্লিষ্টতার আভাস মিলেছে। যদি তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে রেখে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘাত সৃষ্টি, গুজব ছড়ানো কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার সংস্কৃতি কোনো সভ্য গণতন্ত্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের আবেগকে ঢাল বানিয়ে রাজনৈতিক খেলা যারা খেলতে চায়, তারা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার পরিবেশ, গণতন্ত্র এবং জাতীয় স্থিতিশীলতারই শত্রু।
এখানেই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর প্রতিটি দাবি হতে হবে প্রমাণভিত্তিক। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য। কেবল ভিন্নমত বা আন্দোলনকে রাজনৈতিক তকমা দিয়ে দমন করার চেষ্টা করলে সরকারই জন-আস্থা হারাবে। প্রকৃত অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা যেমন জরুরি, তেমনি নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের হয়রানি না করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তা কাউকে ছাড় দেয় না, আবার কাউকে অন্যায়ভাবে দোষীও বানায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও এখন রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পরিকল্পিত গুজব, বিভ্রান্তিকর ভিডিও, ভুয়া পরিচয়ে প্রচার কিংবা সংগঠিত অপপ্রচার মুহূর্তেই একটি সীমিত ইস্যুকে জাতীয় অস্থিরতায় রূপ দিতে পারে। তাই শুধু আইন প্রয়োগ নয়, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, দ্রুত তথ্য যাচাই এবং সঠিক তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরার সক্ষমতাও রাষ্ট্রকে বাড়াতে হবে। তথ্যের শূন্যতা সব সময় গুজবের সবচেয়ে বড় পুঁজি।
আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি রাষ্ট্র শুনবে, তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে। আবার আন্দোলনের আড়ালে যারা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, নাশকতা, উসকানি বা অস্থিতিশীলতার নীলনকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধেও আইন কঠোর হবে। তবে সেই কঠোরতা হতে হবে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে, প্রতিহিংসার নয়; প্রমাণের ভিত্তিতে, অনুমানের নয়।
আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, সরকার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য জাতির সামনে তুলে ধরবে। সেই সঙ্গে প্রকৃত উসকানিদাতাদের বিচারের মুখোমুখি করে শিক্ষার্থীদের আস্থা পুনর্গঠনে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের প্রতিটি যৌক্তিক ক্ষোভ ভবিষ্যতেও রাজনৈতিক স্বার্থসন্ধানীদের হাতিয়ার হয়ে উঠবে, আর সেই ভুলের চড়া মূল্য শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন