ঢাকা রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

আত্মসাৎ নয়, মাজারের ‘দানবক্স’ কাজে লাগান

সালমান ফরিদ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০১:২৬ এএম

ওলি-আউলিয়ার পুণ্যভূমি, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানীখ্যাত সিলেটের বুকে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে মহিমান্বিত হযরত শাহজালাল ইয়ামেনীর (রহ.) মাজার শরিফ। সাতশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ঐতিহাসিক দরগাহ কেবল কোনো ভৌগোলিক স্থাপনা কিংবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেই নয়, বরং এটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্র এবং দল-মত নির্বিশেষে কোটি কোটি মানুষের পরম আবেগ, চিরন্তন বিশ্বাস ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয়ের স্থল হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। প্রাত্যহিক জীবনের নানা জাঁতাকলে পিষ্ট, রোগ-শোক, অভাব-অনটন আর মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত মানুষ যখন কোথাও কোনো কূল-কিনারা পায় না, ভরসা পায় না, আশ্রয়ের শেষ ধাপ পেরিয়ে যায়, তখন তারা ছুটে আসে এই পুণ্যভূমিতে। বুকভরা আশা, চোখে জল আর অন্তরে অলৌকিক বিশ্বাসের আলো নিয়ে তারা দরগাহর চৌকাঠে মাথা নোয়ায়।

এই যে মানুষের অবর্ণনীয় আবেগ আর আধ্যাত্মিক অনুভূতি, এরই বস্তুগত বহিঃপ্রকাশ ঘটে মাজারের দানবাক্সগুলোতে। প্রতিদিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সারা বিশ্ব থেকে হাজার হাজার ভক্ত, আশেকান ও দর্শনার্থী তাদের মানত, কৃতজ্ঞতা ও ভক্তির অর্ঘ্য হিসেবে দরগাহর ডেগ আর বাক্সগুলোতে টাকা, সোনা-দানা, মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা কিংবা লঙ্গরখানার জন্য গবাদিপশু ও খাদ্যসামগ্রী অকাতরে দান করে থাকেন। মানুষ যখন এই দান করে, তখন তার মনে কোনো পার্থিব হিসাব-নিকাশ থাকে না, থাকে কেবল পরম সত্তার সন্তুষ্টি আর ওলির প্রতি গভীর ভালোবাসা তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সমাজব্যবস্থার রূপান্তর এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় ও ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি হওয়া গণজাগরণ, বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদসহ দেশের বড় বড় মাজারের দানবাক্স থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা ও সোনা-দানা উদ্ধারের চিত্র এবং সেসব অর্থের ব্যবহার নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া ব্যাপক আলোড়ন, স্বাভাবিকভাবেই সচেতন মহলে সিলেটের এই ঐতিহাসিক দরগাহর বিপুল দান, এর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক ও নতুন করে গভীর ভাবনার উদ্রেক করেছে। মাজারে মানুষের এই যে কোটি কোটি টাকা ঢেলে দেওয়ার প্রবণতা, এর পেছনে রয়েছে জটিল সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট। কারণ বাঙালি সংস্কৃতির মনস্তত্ত্বে সুফিবাদ ও পির-আউলিয়াদের প্রতি ভক্তি অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত।

তাদের মনের আকাক্সক্ষা থাকে, এই অর্থের প্রতিটি পাইপয়সা মাজারের পবিত্রতা রক্ষা, আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকা ফকির-মিসকিনদের সেবা, দরগাহর ঐতিহ্যবাহী লঙ্গরখানায় আসা ক্ষুধার্ত মুসাফিরদের অন্নসংস্থান এবং ধর্মীয় ও পারলৌকিক কল্যাণমূলক কাজেই ব্যয় হবে। সেখানে কখনো তারা ভাবতেও পারে না যে, তাদের ভক্তি আর বিশ্বাসের অশ্রুজলে ভেজা টাকা কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের বিলাসী জীবনের জ্বালানি হতে পারে। মানুষ দান করে নিজের আত্মিক মুক্তির জন্য। গুনাহ খাতার ক্ষমার আশায় এবং নিজের মানসিক দায়বদ্ধতা থেকে। এই আবেগ এতটাই তীব্র ও সংবেদনশীল, এখানে যুক্তিবাদ বা বস্তুগত হিসাব-নিকাশ গৌণ হয়ে পড়ে। কিন্তু বাস্তবতার জমিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা এই বিপুল অর্থের গতিপথ অনুসন্ধান করতে যাই, তখন বিশাল ধোঁয়াশা ও প্রাতিষ্ঠানিক অস্বচ্ছতার দেয়াল সামনে এসে দাঁড়ায়। এটা সত্য যে, দরগাহর লঙ্গরখানায় প্রতিদিন বা কখনো হাজারো মানুষের বিনা মূল্যে খাবার সরবরাহ করা হয়; যা এই দানের অর্থের একটি দৃশ্যমান ও ইতিবাচক দিক।

মাজারের বিশাল চত্বরের পরিচ্ছন্নতা, সুউচ্চ মিনারের আলোকসজ্জা, বার্ষিক ওরসের বিশাল আয়োজনও এই অর্থ থেকে নির্বাহ করা হয়। কিন্তু প্রশ্নটা উঠছে এই দৃশ্যমান ব্যয়ের বাইরের বিশাল অংশটি নিয়ে। প্রতি মাসে বা প্রতি বছর এই দরগাহে ঠিক কী পরিমাণ টাকা, সোনা-দানা বা বৈদেশিক মুদ্রা জমা হয়, তার কোনো সুনির্দিষ্ট, আধুনিক ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হিসাব বিবরণী বা অডিট রিপোর্ট কখনোই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় না। খাদেমদের একটি বড় অংশের জীবনযাত্রার মান, তাদের পারিবারিক বৃত্তের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং মাজারের অভ্যন্তরীণ আয়-ব্যয়ের ওপর তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিলেটের স্থানীয় মানুষ ও সচেতন মহলে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের চাপা গুঞ্জন ও অসন্তোষ রয়েছে; যা প্রকারান্তরে হযরত শাহজালালের (রহ.) মতো একজন মহান সুফি সাধকের পবিত্র স্মৃতির মর্যাদাকে ক্ষুণœ করে। এই গতিহীন ও রুদ্ধদ্বার ব্যবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে এবং মাজারের অর্থ লোপাট বন্ধ, শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আলোচিত জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদারকির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তারপর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মাজারের দীর্ঘদিনের সিন্দুক ও দানবাক্সগুলো খোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথম দফায় মাত্র ৪ দিনের টাকা গণনায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া যায়, যা একটি মাজারের স্বল্প সময়ের সাধারণ দানবাক্স থেকে প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এক বিশাল অঙ্ক ছিল। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে যখন আবারও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ উপায়ে এবং সিসিটিভি ক্যামেরার কঠোর নজরদারিতে দ্বিতীয়বার টাকা গণনার কাজ সম্পন্ন হয়, তখন পূর্বের চেয়ে দীর্ঘ ১৯ দিনের ব্যবধানে ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা এবং সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও সোনা-দানা সংগৃহীত হয়; যা প্রমাণ করে, অতীতে সঠিক তদারকি ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাব ঠিক কতটা প্রকট ছিল।

তবে এই প্রশাসনিক তদারকি ও ডেগ, দানবাক্স খোলার প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক ঘটনা সবার সামনে উন্মোচিত হয়, যখন দেখা যায় মাজারের ভেতরে থাকা অত্যন্ত সুরক্ষিত ও তালাবদ্ধ ডেগের খাঁচার রড কাটা ছিল; যা মাজারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার চরম গলদ এবং অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী চুরির সুগভীর চক্রান্তের দিকে সরাসরি আঙুল তোলে।

সুফি-সাধক, ওলি-আউলিয়াদের মূল শিক্ষা, জীবনদর্শনই ছিল মানবকল্যাণ, আত্মত্যাগ, অহিংসা, আধ্যাত্মিক শুদ্ধি এবং বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন। হযরত শাহজালাল (রহ.) যখন সিলেটে এসেছিলেন, তখন তিনি কেবল ধর্ম প্রচার করেননি, বরং অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে এ অঞ্চলের মানুষকে মুক্ত করে একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই তার মাজারকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনিয়ম, ব্যক্তিগত বিলাসিতা বা অস্বচ্ছ অর্থ লেনদেনের সুযোগ থাকা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থের সঠিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে, ডেগের খাঁচার রড কাটার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করে মাজার সংকট দূর করতে এবং একে মানবসেবার শ্রেষ্ঠ হাতিয়ারে পরিণত করতে আমূল পরিবর্তন ও সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। যার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মাজারের সব দানবাক্স ও আয়ের উৎসগুলোকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। ডেগ ও দানবাক্স খোলার প্রক্রিয়া সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে করে জেলা প্রশাসন, ওয়াকফ বোর্ড ও দেশের শীর্ষস্থানীয় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের সমন্বয়ে প্রতি তিন মাস পর পর একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের অডিট সম্পন্ন করা যেতে পারে। এই অডিট রিপোর্ট বা আয়-ব্যয়ের বার্ষিক খতিয়ান সর্বসাধারণের দেখার জন্য দরগাহর নিজস্ব ওয়েবসাইট, জাতীয় গণমাধ্যম এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে প্রকাশ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, দানকৃত এই বিপুল বিত্তকে শুধু লঙ্গরখানা, জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা, বার্ষিক ওরসের উৎসব বা নির্দিষ্ট কিছু প্রথাগত গ-ির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, একে একটি সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক কল্যাণমুখী ট্রাস্টের অধীনে নিয়ে আসা দরকার। এই ট্রাস্টের মাধ্যমে বৃহত্তর সিলেট তথা সমগ্র দেশের কল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই কিছু প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। যার মধ্যে অর্থাভাবে ঝরে পড়া হাজারো দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য ‘শাহজালাল রহ. মেধা বৃত্তি’ চালু করা এবং আধুনিক মানসম্মত ফ্রি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করা যায়; যা যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করবে। এর পাশাপাশি দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সম্পূর্ণ নিঃখরচায় সর্বাধুনিক চিকিৎসাসেবা, ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি ও ওষুধ সরবরাহের লক্ষ্যে একটি বৃহৎ আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এ ছাড়াও সিলেট অঞ্চলে প্রতি বছর যে ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙন হয়, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত, গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের স্থায়ী ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি দিয়ে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার কাজে এই অর্থ সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে। কেননা মাজারে টাকা দান করা মানুষের পবিত্র অধিকার ও অনুভূতির বিষয়, কিন্তু সেই টাকার সঠিক হিসাব ও জনকল্যাণে তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা মাজার কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। হযরত শাহজালালের (রহ.) দরগাহ শরিফের ঐতিহাসিক ভাবমূর্তি রক্ষা, এর আধ্যাত্মিক পবিত্রতা বজায় রাখা এবং যেকোনো ধরনের গোপন আত্মসাৎ, অর্থপাচার কিংবা অস্বচ্ছতার কুৎসিত সুযোগ চিরতরে বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। যাতে মানুষের পবিত্র আবেগ আর বিশ্বাসের জায়গাটি যেন কোনো নির্দিষ্ট মহলের ব্যক্তিগত আখের গোছানোর বা বিলাসিতার মাধ্যমে পরিণত না হয়। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল ভক্তদের মনের আকাক্সক্ষা পূর্ণ হবে, ওলির পবিত্র আত্মার প্রতি সঠিক সম্মান প্রদর্শন করা হবে এবং এই মাজারের দান হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম বৃহৎ মানবিক ও সামাজিক সম্পদ, যা লাখো মানুষের মুখে হাসি ফোটাবে।