ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

বর্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি : পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ০৩:১৯ এএম

বর্ষাকাল প্রকৃতির নবজাগরণের ঋতু। এ সময় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় বৃক্ষরোপণের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাই বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমকে বৃক্ষরোপণের প্রধান সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে শুধু গাছ লাগালেই পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়; লাগানো গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতা সামনে রেখে বর্তমান সরকার বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি প্রতিটি চারা গাছের যতœ নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্র তাপপ্রবাহ, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ব্যাপক সবুজায়নের বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যেই সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়; বরং পরিবেশ সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।

এই কর্মসূচির বিশেষত্ব হলো, সংখ্যার চেয়ে গাছের টিকে থাকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ হলেও পরিচর্যার অভাবে অনেক চারা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। বর্তমান সরকার সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনকে রোপণের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে। কারণ একটি চারা রোপণ করা যত সহজ, সেটিকে পূর্ণবয়স্ক গাছে পরিণত করা ততটাই দায়িত্ব ও ধৈর্যের বিষয়।

সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের তাৎপর্য বহুমাত্রিক। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ সবুজ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণের মানসিকতা গড়ে উঠবে। শিশুরা যখন নিজের হাতে একটি গাছ লাগাবে এবং তার পরিচর্যা করবে, তখন তাদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হবে। পরিবেশ সচেতন নাগরিক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি একটি কার্যকর বিনিয়োগ।

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশও দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। রাস্তার পাশ, সরকারি খাসজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নদীতীর এবং পতিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ দেশের বনায়ন সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পরিবেশবিদদের মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে। পাশাপাশি গাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্র বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। ফলে বৃক্ষরোপণ কেবল পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সফল বৃক্ষরোপণের জন্য শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো কর্মসূচিই দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য পেতে পারে না। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, বারান্দা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরের প্রাঙ্গণ কিংবা পতিত জমিÑ যেখানে সুযোগ রয়েছে, সেখানেই গাছ লাগানোর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেকে যদি অন্তত একটি গাছের দায়িত্ব নেন, তাহলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সাফল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

গাছ নির্বাচনেও পরিকল্পনা জরুরি। দেশের জলবায়ু ও মাটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেশীয় প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে, জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হবে এবং স্থানীয় মানুষও অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে। বিদেশি বা দ্রুতবর্ধনশীল প্রজাতির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব দেশীয় বৃক্ষরোপণ দীর্ঘমেয়াদে অধিক কার্যকর।

বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি পরিচর্যার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও সময়ের দাবি। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার, প্রয়োজনে পানি দেওয়া, পশুর ক্ষতি থেকে রক্ষা করা এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। একটি চারা অন্তত দুই থেকে তিন বছর যতœ পেলে সেটি স্বনির্ভরভাবে বেড়ে ওঠার সক্ষমতা অর্জন করে। তাই স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণকে অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সবুজায়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। বর্তমান সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের বনভূমি বৃদ্ধি পাবে, পরিবেশগত ভারসাম্য সুদৃঢ় হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ পাবে।

বর্ষার এই মৌসুম তাই কেবল গাছ লাগানোর সময় নয়, পরিবেশ রক্ষার সামাজিক অঙ্গীকার নবায়নেরও সময়। সরকারি উদ্যোগকে সফল করতে প্রত্যেক নাগরিকের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আজ যে চারা রোপণ করা হবে, আগামী দিনে সেই গাছই দেবে ছায়া, ফল, বিশুদ্ধ অক্সিজেন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার শক্তি। তাই আমাদের অঙ্গীকার হোকÑ শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, প্রতিটি গাছের পরিচর্যা নিশ্চিত করে একটি সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি