‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এই আপ্তবাক্যটি আমাদের ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল যে, আমরা মনে করতাম মেরুদ-টা বোধহয় ঘাড়ের নিচ থেকে নিতম্ব পর্যন্ত কোনো হাড়ের কাঠামো নয়, বরং প্রতিটি অক্ষরে আর পরীক্ষার খাতায় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া।
কিন্তু বর্তমান সময়ের অস্থিরতা, পরীক্ষার হল থেকে শিক্ষকদের লাঞ্ছনা, প্রশ্নপত্র ‘কমন না পাওয়ার’ অজুহাতে ভাঙচুর এবং ‘অটোপাসের’ দাবিতে রাজপথ উত্তপ্ত করার দৃশ্যগুলো দেখে মনে হচ্ছে, জাতির সেই মেরুদ-ে এখন ডিস্ক প্রলাপের দশা! আমাদের বাপ-দাদারা যখন পড়াশোনা করতেন, তখন শিক্ষা ছিল অনেকটা ‘এভারেস্ট জয়’-এর মতো। তখন গুগল ছিল না, ছিল না বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা। দূর-দূরান্ত থেকে মাইলের পর মাইল কর্দমাক্ত পথ হেঁটে, কখনো বুক সমান জল পার হয়ে, বইগুলো মাথার ওপর কলাপাতায় পেঁচিয়ে শিক্ষালয়ে পৌঁছাতে হতো। কারোর গায়ে হয়তো ভালো জামা ছিল না, ছিল না ঝকঝকে ব্যাগ। সেই অদম্য চেষ্টায় তারা বড় বড় চাকরি করেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য সামলেছেন এবং আজ যেটুকু উন্নয়ন আমরা দেখি, তার ভিত্তিপ্রস্তর তারাই স্থাপন করেছিলেন। তারা বুঝতেন, জ্ঞানের পরিধি কেবল বইয়ের পাতায় নয়, বরং মাঠের ঘাসে, মানুষের অভিজ্ঞতায় এবং পরিশ্রমের ঘামে। আর আজকের প্রজন্ম? এখন পড়াশোনা মানে যেন ‘ডেলিভারি সার্ভিস’। ঘরে বসে রিমোট টিপলে যেমন খাবার চলে আসে, পরীক্ষার ফলও ঠিক তেমনই ‘অটো’ হতে হবে! যারা অটোপাসের দাবিতে লাঠিসোটা নিয়ে রাজপথে নামেন, তাদের দেখে মনে হয়, পড়াশোনা করার চেয়ে রাজপথের ব্যারিকেড দেওয়া অনেক বেশি সহজ। অথচ, একদা আমাদের পূর্বপুরুষরা বলতেন, ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’। আর আজ সেই প্রবাদ বদলে দাঁড়িয়েছে ‘অটোপাসই সৌভাগ্যের চাবিকাঠি’। কী বিচিত্র এই বিবর্তন!
কী অদ্ভুত এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি আমরা! নকল রোধ, শিক্ষার মানদ- উন্নয়ন এবং ফ্যাসিস্ট আমলের জঞ্জাল সরিয়ে যখন প্রকৃত শিক্ষার পথে উত্তরণ ঘটছে, ঠিক তখনই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মতো অযৌক্তিক আন্দোলনের ডাক দেওয়া হচ্ছে। এই আন্দোলনের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এরা প্রকৃত ‘শিক্ষার্থী’ হওয়ার চেয়ে ‘পরীক্ষার্থী’ হওয়ার প্রতিযোগিতায় বেশি ব্যস্ত। শিক্ষার্থী আর পরীক্ষার্থীর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। শিক্ষার্থী জ্ঞান আহরণ করে, আর পরীক্ষার্থী কেবল পাস করার কৌশল খোঁজে। যারা অটোপাসের দাবি তোলে, তারা মূলত পড়াশোনার কষ্টটুকু স্বীকার করতে নারাজ। অনেক ক্ষেত্রেই এই আন্দোলনের পেছনে থাকে গুটিকয়েক অসাধু চক্র, যারা পরীক্ষার হলে নকল করার সুযোগ হারিয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থাকে যেভাবে দলীয়করণ ও মেধাহীনতায় ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল, সেই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসাটা তাদের জন্য কষ্টের। তাই তারা পুরোনো সেই মুখস্থ বিদ্যার ও সার্টিফিকেট বাণিজ্যের দিনগুলোই ফিরিয়ে আনতে চায়। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাওয়া আসলে কোনো নৈতিক দাবি নয়, এটি মূলত পরিবর্তনকে ভয় পাওয়ার এক অশুভ লক্ষণ। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন হতে পারে, কিন্তু সেই অধিকার যদি হয় ‘পরীক্ষা না দিয়ে পাস করার’, তবে তা অধিকার থাকে না, সেটি অপরাধে রূপ নেয়। যারা এই আন্দোলনের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তারা মূলত নিজের পায়ে কুড়াল মারছে। প্রকৃত শিক্ষার্থী হওয়া মানেই হলো প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য ও ন্যায়ের পথে টিকে থাকা। যারা এই সহজ সত্যটি বোঝে না, তারা কোনোভাবেই শিক্ষার প্রকৃত দাবিদার হতে পারে না। এই আন্দোলনগুলো আসলে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে এক ধরনের মৌলবাদী আচরণ, যা আমাদের মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ার পথে বড় বাধা।
প্রাচীনকালে গুরুকুল কিংবা টোলগুলোতে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘চরিত্র গঠন’। সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘শিক্ষা হলো অন্তরের আলো।’ কিন্তু আমাদের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় সেই আলো এখন ‘এলইডি বাল্ব’-এর মতো হয় জ্বলছে, নয়তো ফিউজ হয়ে যাচ্ছে। জাপানের ‘ইকিগাই’ দর্শনের কথা সবাই বলে, অথচ নিজের জীবনের উদ্দেশ্য না খুঁজে আমাদের তরুণরা খুঁজছে ‘জিপিএ-৫’ নামক সোনার হরিণ। প্রশ্নপত্র কমন না পড়লে তারা ভাঙচুর চালায়। যেন পরীক্ষার খাতাটা কোনো রণক্ষেত্র, আর শিক্ষক হচ্ছেন শত্রু! শিক্ষার পবিত্র আঙিনায় শিক্ষকের গায়ে হাত তোলা যে কতটা ভয়াবহ, তা কেবল একটি অসভ্য সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। জ্ঞানীর কদর যেখানে নেই, সেখানে তো অরাজকতাই রাজত্ব করবে। বর্তমান সময়ে শিক্ষার নামে যা চলছে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এক প্রকার তথ্য আদান-প্রদান মাত্র। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক নয়। তথ্য কেবল মাথায় জমা থাকে, কিন্তু জ্ঞান হৃদয়কে আলোকিত করে, মানবিক বোধের জন্ম দেয়। ভোলার চরফ্যাশনের ফাতেমা-মতিন মহিলা কলেজে শিক্ষকদের ওপর যে হামলা হলো, তা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার মতো। কেন এই আন্দোলন? কারণ, পড়াশোনার চেয়ে শর্টকাট পথে সাফল্য পাওয়াটা এখন স্মার্টনেস। অথচ জিপিএ-৫ কোনোদিন মানুষের প্রকৃত মেধা বা নৈতিকতার পরিমাপক হতে পারে না।
বহির্বিশ্বের দিকে তাকাই। এরমধ্যে ফিনল্যান্ড, জাপানের উদাহরণ টানা যাক। সেখানে শিশুকে ‘পরীক্ষার্থী’ হিসেবে নয়, ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ফিনল্যান্ডে স্ট্যান্ডার্ডাইজড পরীক্ষার বালাই নেই। শিক্ষার্থী সেখানে শেখে আনন্দ পাওয়ার জন্য। আর আমাদের এখানে? পরীক্ষার হলে ডিউটি পালনকারী শিক্ষক যেন একজন জল্লাদ! অথচ এরিস্টটল বলে গেছেন, ‘শিক্ষার শিকড় তিতা হলেও এর ফল মিষ্টি।’ আজকের প্রজন্ম সেই শিকড়ের তেতো স্বাদ নিতে নারাজ, কিন্তু ফলের আশা করে আকাশকুসুম। আন্তর্জাতিক মানদ-ে টিকে থাকতে হলে আমাদের ‘পরীক্ষা ভীতি’ কাটিয়ে ‘দক্ষতা ভিত্তিক’ শিক্ষায় ফিরতেই হবে। সারাবিশ্বে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে লড়াই চলছে, তখন আমরা লড়ছি অটোপাসের দাবিতেÑ এই বৈপরীত্যই আমাদের পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল সনদ দিয়ে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। সেখানে প্রয়োজন সৃজনশীলতা, জটিল সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা এবং ল্যাঙ্গুয়েজ স্কিল। আমরা কি কেবল সনদধারী বেকার তৈরির কারখানা হয়েই থাকব? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেবল সিলেবাসের গ-িতে আটকে না রেখে বাস্তবমুখী করতে হবে। হাতে-কলমে শিক্ষা এবং প্রয়োগিক জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। যদি আমরা মনে করি যে কেবল পরীক্ষার খাতায় কিছু লিখে পাস করলেই শিক্ষা পূর্ণ হয়, তবে আমরা মস্ত ভুল করছি। শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা মৃত্যু পর্যন্ত চলে। আজ যারা অটোপাসের দাবিতে রাজপথ উত্তপ্ত করছেন, তারা হয়তো সাময়িকভাবে সফল হতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তারা নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। কারণ, যে জ্ঞান তারা অর্জন করেনি, তা দিয়ে তারা কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারবে না।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হলে আমাদের কিছু বিষয় কঠোরভাবে পালন করতে হবে। যেমন, মূল্যায়ন পদ্ধতির আমূল সংস্কার, শিক্ষকের মর্যাদা পুনরুদ্ধার, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সৃজনশীল পদ্ধতির নামে গোলক ধাঁধা তৈরি হয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থীর ব্যবহারিক ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা যাচাই করতে হবে। শিক্ষককে কেবল জ্ঞানদানকারী নয়, জাতির রক্ষক হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। রাজনীতির কালো ছায়া থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মুক্ত করতে হবে। পাঠ্যবইয়ে নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বিবেকবান না হয়ে শিক্ষিত হওয়া কেবল সমাজের জন্য বোঝা তৈরি করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের এই অস্থিরতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরতা পরীক্ষা করছে। বাপ-দাদারা যে ত্যাগের বিনিময়ে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, সেই গৌরবের ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। তারা অভাবের তাড়নায় পড়াশোনা করে রাষ্ট্রকে গড়েছিলেন, আর আমরা সুযোগের প্রাচুর্যে পড়েও যদি পড়াশোনা না করি, তবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। আসুন, অটোপাসের বিষবাষ্প ছেড়ে মেধার আলোয় আলোকিত হই। মনে রাখতে হবে, শর্টকাটে সাফল্যের পথ হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু সেই পথ গন্তব্যে পৌঁছায় নাÑ তা শুধু গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খায়। শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের অধিকার। তবে সেই অধিকার অর্জনের জন্য লড়াই করতে হয় মেধায়, অটোপাসে নয়। আগামীর বাংলাদেশে আমরা এমন এক প্রজন্ম চাই, যারা কেবল সার্টিফিকেট বহন করবে না, বরং তাদের মেধার আলোয় বিশ্বজয় করবে। আমাদের শপথ হোকÑ প্রশ্নপত্র কমন পড়ুক বা না পড়ুক, আমাদের নৈতিকতা যেন কখনোই ‘বিস্মৃত’ না হয়।
আমরা কি পারি না নতুন করে এক শিক্ষা বিপ্লবের সূচনা করতে? যেখানে শিক্ষক হবে শ্রদ্ধেয়, মেধা হবে মূল চালিকাশক্তি, আর নৈতিকতা হবে জীবনের ভিত্তি। সময় এসেছে সচেতন হওয়ার, সময় এসেছে পেছনে ফিরে তাকার এবং নতুন করে পথ চলার। চলুন, আমরা সবাই মিলে একটি আধুনিক, সৃজনশীল ও নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলি। কারণ, আজকের শিক্ষিতরাই হবে আগামীর দেশ গড়ার কারিগর।

