ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

সম্পাদকীয়

সরকারি হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধ হোক

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:৪৩ এএম

সরকারি হাসপাতাল সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। সীমিত সামর্থ্যরে মানুষ ন্যূনতম খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশায় এসব হাসপাতালে ছুটে আসেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, চিকিৎসাসেবা নিতে এসে অনেক রোগী ও তাদের স্বজনকে এখন প্রথমেই মুখোমুখি হতে হয় এক ভয়ংকর দালাল চক্রের। হাসপাতালের মূল ফটক থেকে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, পরীক্ষাগার, এমনকি ওয়ার্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এই চক্র বছরের পর বছর ধরে সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে জিম্মি করে রেখেছে। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা শুধু আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিও তাদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে পরিচালিত অভিযানে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, দালালদের কার্যক্রম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। তারা রোগীদের ভুল তথ্য দিয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছে, সরকারি হাসপাতালে থাকা সেবাকেও অপ্রয়োজনীয় বলে বাইরে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করছে, কমিশনের বিনিময়ে রোগী ভাগিয়ে নিচ্ছে, এমনকি রক্ত সংগ্রহের মতো মানবিক বিষয়কেও বাণিজ্যে পরিণত করেছে। এর সঙ্গে হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারী, বাইরের ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক এবং বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী পক্ষের যোগসাজশের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। ফলে এটি আর শুধু দালাল সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সুশাসনের সংকটে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযান হয়, কয়েকজন আটকও হন, কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তারা জামিনে বেরিয়ে আবার আগের মতো সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এতে স্পষ্ট, কেবল ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন একটি আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো, যা দালালচক্রের পুনরুত্থানের পথ বন্ধ করবে এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনবে।

একটি সরকারি হাসপাতালে যদি কোনো রোগী লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন, আর দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিলেই কয়েক মিনিটে সব কাজ হয়ে যায়, তাহলে সেটি শুধু দুর্নীতির নয়, রাষ্ট্রের সেবাব্যবস্থার নৈতিক পরাজয়েরও প্রতীক। এই সংস্কৃতি যতদিন চলবে, ততদিন সৎভাবে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অর্জনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সরকারের পক্ষ থেকে আইনের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে এবং কঠোর আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে। এটি ইতিবাচক। তবে আইন সংশোধনের পাশাপাশি বাস্তবায়নই হতে হবে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে স্থায়ী মনিটরিং ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নজরদারি, সিসিটিভির কার্যকর ব্যবহার, ডিজিটাল টিকিট ও পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা, রোগী সহায়তা ডেস্ককে আরও কার্যকর করা এবং হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে অবৈধ দালালদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কমিশনের মাধ্যমে রোগী সংগ্রহ করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অনুমোদনহীন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধেও নিয়মিত অভিযান জরুরি।

সরকারি হাসপাতাল জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হয়। সেখানে রোগীদের চিকিৎসাসেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে, দালালের শরণাপন্ন হতে হবে কিংবা প্রতারণার শিকার হতে হবে, এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক অধিকার; এটি কোনো কমিশননির্ভর বাণিজ্য নয়।

আমরা আশা কারব, সরকার ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর আইন, কঠোর নজরদারি এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালগুলোকে দালালমুক্ত করবে। কারণ একটি দালালমুক্ত হাসপাতাল শুধু রোগীর অর্থ সাশ্রয় করবে না, রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও মর্যাদাও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে।