ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

উড়ন্ত চাকতির আড়ালে ক্ষমতার রাজনীতি

আমানুর রহমান 
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:৪৫ এএম

মহাকাশের অসীম শূন্যতা এবং ভিনগ্রহের প্রাণীদের নিয়ে মানুষের কৌতূহল চিরন্তন। তবে সম্প্রতি এই কৌতূহল বিশ্বজুড়ে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিগত কয়েক দশক ধরে আকাশে দৃশ্যমান অজানা উড়ন্ত বস্তু বা ‘ইউএফও’ নিয়ে মানুষের জল্পনাকল্পনার কোনো শেষ নেই। এই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়ে সম্প্রতি ২০২৬ সালের মে মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর তাদের ১৬২টি গোপন ইউএফও নথি জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে ২৮টি ভিডিও এবং ১৪টি ছবি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকাশিত এসব নথিতে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যা পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ সূত্রগুলোকে যেন রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। 

ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায়, আনআইডেন্টিফাইড ফ্লাইং অবজেক্ট বা ইউএফও দেখার এই হিড়িক মূলত শুরু হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের উত্তপ্ত সময়গুলোতে, এবং এর সঙ্গে মার্কিন সামরিক তৎপরতার এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৪৭ সালের ২৪ জুন প্রাইভেট পাইলট কেনেথ আর্নল্ড মাউন্ট রেনিয়ারের আকাশে ঘণ্টায় প্রায় ১২০০ মাইল বেগে উড়ন্ত নয়টি উজ্জ্বল বস্তু দেখতে পান, যার পরই সংবাদমাধ্যমে ‘ফ্লাইং সসার’ বা উড়ন্ত পিরিচ শব্দটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এই একটি শব্দ গোটা বিশ্বের মানুষের মনে এমনভাবে গেঁথে যায় যে, তা একটি বিশাল সাংস্কৃতিক উন্মাদনার জন্ম দেয়। এর ঠিক কয়েক সপ্তাহ পরেই নিউ মেক্সিকোর রোজওয়েলে একটি রহস্যময় বস্তু আছড়ে পড়ে। শুরুতে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এটিকে ‘ফ্লাইং ডিস্ক’ বলা হলেও, পরদিন তা ‘আবহাওয়া বেলুন’ বলে ধামাচাপা দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় পর ১৯৯৪ সালে পেন্টাগন স্বীকার করে যে, রোজওয়েলের সেই বস্তুটি মূলত ‘প্রজেক্ট মোগুল’-এর অংশ ছিলÑ যা সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক পরীক্ষা নজরদারির জন্য তৈরি করা এক অতিগোপন গুপ্তচর বেলুন। ১৯৫২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত চলা মার্কিন সরকারের ‘প্রজেক্ট ব্লু বুক’-এ ১২ হাজারেরও বেশি ইউএফও দেখার ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যার মধ্যে ৭০১টি ঘটনার কোনো বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা তখন মেলেনি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৯৪৭ সালের নিউ মেক্সিকো ও জার্মানি থেকে শুরু করে ২০২৩ সালের ইরাক বা ২০২৪ সালের সিরিয়া ও জাপানÑ অধিকাংশ ইউএফও দেখা গেছে ঠিক সেখানেই, যেখানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী রাডার ও সবচেয়ে জোরালো উপস্থিতি রয়েছে। কাজেই ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, ইউএফও-্এর উপস্থিতির সঙ্গে মহাকাশবিজ্ঞানের চেয়ে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও সামরিক আধিপত্য বিস্তারের সম্পর্কই অনেক বেশি নিবিড়।

১৯৬৫ সালে আমেরিকার স্পেস ফ্লাইট ‘জেমিনাই ৭’-এর উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টা পর মহাকাশচারী ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান রেডিও বার্তায় সামরিক পরিভাষায় একটি অজানা উড়ন্ত বস্তুর কথা জানান। মহাশূন্যে এমন সামরিক শব্দের ব্যবহার ছিল কল্পনাতীত, যা প্রমাণ করে বস্তুটি মহাকাশের স্বাভাবিক আবর্জনা বা বুস্টারের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু ছিল। একইভাবে, ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো ১১ মিশনে বাজ অলড্রিন চাঁদের বুকে আলোর ঝলকানি দেখতে পান এবং ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের একটি ছবিতে চাঁদের ঠিক ওপরে ত্রিভুজাকৃতির তিনটি বিন্দু স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। দীর্ঘ ৫৪ বছর পর মার্কিন সরকারও স্বীকার করেছে যে ওই ছবিতে দৃশ্যমান বিন্দুগুলো কোনো বাস্তব বস্তু হতে পারে। তবে বিখ্যাত বিজ্ঞানী কার্ল সেগানের সেই কালজয়ী উক্তির কথা আমাদের মনে রাখতে হবেÑ ‘অসাধারণ দাবির জন্য অসাধারণ প্রমাণের প্রয়োজন হয়।’ মহাকাশে দেখা এই আলোগুলো বা বিন্দুগুলো ভিনগ্রহীদের কোনো উন্নত যান হওয়ার চেয়ে প্রাকৃতিক কোনো মহাজাগতিক ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনাই অনেক বেশি। স্বয়ং নীল আর্মস্ট্রংয়ের মতে, এগুলো হয়তো জানালার ফাঁক গলে আসা সূর্যের আলোর প্রতিফলন বা মহাশূন্যের কোনো বিশেষ পারমাণবিক কণা। মহাশূন্যে সর্বদা বিভিন্ন ধরনের বিকিরণ ও আলোর প্রতিসরণ ঘটে থাকে, যা অনেক সময় দৃষ্টিভ্রমের সৃষ্টি করে। বিজ্ঞান সর্বদা অকাট্য প্রমাণের ওপর নির্ভর করে; তাই মহাকাশে দৃষ্ট এই অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোকে ভিনগ্রহীদের অস্তিত্ব প্রমাণের চূড়ান্ত হাতিয়ার হিসেবে মেনে নেওয়ার আগে আরও চুলচেরা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অপরিহার্য।

আধুনিক যুগের উন্নত প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যকার গুপ্তচরবৃত্তির নতুন ধরন এই ইউএফও তত্ত্বকে কল্পকাহিনির জগৎ থেকে নামিয়ে এনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ২০২৩ সালে গ্রিসের আকাশে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর এবং ২০২৪ সালে জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যে এমন কিছু বস্তু দেখা গেছে, যা ঘণ্টায় ৮০ মাইল বেগে উড়ে হঠাৎ করে ৯০ ডিগ্রি কোণে মোড় নিতে সক্ষম। জড়তা ও পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ সূত্র অনুযায়ী, মানুষের তৈরি কোনো গতানুগতিক বিমানের পক্ষে এমন নড়াচড়া প্রায় অসম্ভব। 

ইরাক বা সিরিয়ার মতো সামরিক হটস্পটগুলোতে ইরান বা হুথিদের অত্যাধুনিক ড্রোনের উপস্থিতিও ইউএফও দেখার ঘটনাগুলোকে প্রতিনিয়ত উসকে দিচ্ছে। ভিনগ্রহীদের কাল্পনিক আক্রমণের চেয়ে তাই আধুনিক বিশ্বে শত্রুরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক গুপ্তচর ড্রোন এবং গোপন নজরদারি প্রযুক্তিই যে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

ইউএফও-এর এই রোমাঞ্চকর আলোচনা শুধু সামরিক বা প্রযুক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি রাজনৈতিক চাতুর্য ও জনমত নিয়ন্ত্রণের এক মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বহুকাল ধরে। একটি দেশের সরকার যখন কোনো স্পষ্ট বিশ্লেষণ, প্রেক্ষাপট বা সুনির্দিষ্ট উপসংহার ছাড়াই অগণিত গোপন নথি জনসমক্ষে উন্মুক্ত করে দেয়, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে সূক্ষ্ম কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপটিক্যাল ইলিউশন বা নি¤œমানের ইনফ্রারেড ভিডিওগুলোকে ভিনগ্রহীদের যান হিসেবে প্রচার হতে দিলে সামরিক বাহিনীরই আখেরে লাভ বেশি। এতে করে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম একটি অমীমাংসিত রহস্য নিয়ে মেতে থাকে, আর ঠিক সেই সুযোগে পরাশক্তিগুলো তাদের নিজস্ব অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা লোকচক্ষুর আড়ালে নির্বিঘেœ চালিয়ে যেতে পারে। 

সত্য হলো, রহস্য কেবল সেখানেই ডালপালা মেলে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার তীব্র অভাব থাকে। পরিশেষে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইউএফও-এর এই ধোঁয়াশা ভরা গল্পগুলো ভিনগ্রহের কোনো উন্নত সভ্যতার আগমনের বার্তা নয়; বরং এটি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, সামরিক গোপনীয়তা এবং ক্ষমতার রাজনীতিকে আড়াল করার এক সুনিপুণ ও পরিকল্পিত ধূম্রজাল মাত্র।

আমানুর রহমান 
শিক্ষার্থী, স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা