ঢাকা রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫

কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তি : উৎপাদনশীলতার নতুন দিগন্ত

জিনিয়া তাবাসসুম
প্রকাশিত: নভেম্বর ৩০, ২০২৫, ০১:৫৯ এএম

বাংলাদেশের কৃষি আজ আর লাঙল-জোয়ালের গল্পে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে কৃষির চিত্র বদলে গেছে একেবারে ভেতর থেকে। নতুন প্রজন্মের হাতে উঠে এসেছে ড্রোন, সেন্সর, মোবাইল অ্যাপ ও তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা, যা কৃষিকে করে তুলছে আরও আধুনিক, দক্ষ ও তথ্যনির্ভর। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্মার্ট কৃষিই এখন সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না, বরং কৃষিকে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং ভবিষ্যৎমুখী শিল্পে রূপান্তরিত করছে।

দীর্ঘদিন ধরে যে দেশে কৃষিকে ‘পুরোনো এবং লোকজ পেশা’ হিসেবে দেখা হতো, সেখানে এখন প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ কৃষি তরুণদের মাঝে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। স্মার্ট কৃষি আজ শুধু ফলন বাড়ানোর গল্প নয়; বরং এটি নতুন প্রজন্মকে উদ্ভাবন, সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তা হওয়ার পথ দেখাচ্ছে। কৃষির প্রতিটি ধাপÑ বীজ বপন, সার প্রয়োগ, সেচব্যবস্থা, রোগ শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্তÑ সবকিছুতেই প্রযুক্তির ছোঁয়া এসেছে।

স্মার্ট প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তথ্য। সেন্সর, স্যাটেলাইট ডেটা, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে এখন একজন কৃষক খুব সহজেই জানতে পারেন মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টিমান, পিএইচ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা ফসলে রোগের ঝুঁকি। মাটির সেন্সর দেখিয়ে দেয় কখন সেচ প্রয়োজন এবং কতটুকু সার লাগবে। এতে যেমন অপচয় কমে, তেমনি বাড়ে উৎপাদন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার ছবি বা ডেটা বিশ্লেষণ করে দ্রুত রোগ শনাক্ত করে দেয় এবং উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দেয়। যে কৃষি একসময় পুরোপুরি অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তা আজ বিজ্ঞান, ডেটা এবং রিয়েল-টাইম বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে।

ড্রোন প্রযুক্তি কৃষিতে এনেছে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আকাশ থেকে তোলা ছবির মাধ্যমে জমির প্রতিটি অংশ বিশ্লেষণ করা যায় সহজেই। কোথায় ফসল দুর্বল, কোন জায়গায় রোগ ছড়িয়েছে, কোথায় সেচ কম পড়েছেÑ এসব তথ্য ড্রোনের মাধ্যমে খুব দ্রুত পাওয়া যায়। ফলে কৃষক আর অপেক্ষায় থাকেন না রোগ দেখা দেওয়ার; বরং রোগ ছড়ানোর আগেই সতর্ক হওয়া সম্ভব হয়। ড্রোন যেন এখন মাঠের এক নতুন ‘চিকিৎসক’, যে ফসলের সমস্যা প্রথম থেকেই চিনে নিতে পারে।

শুধু ড্রোন বা সেন্সর নয়, মোবাইল অ্যাপও তরুণ কৃষকদের কাছে হয়ে উঠেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবহাওয়ার অ্যাপ, রোগ শনাক্তকরণ সফটওয়্যার, স্মার্ট সেচ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, মাটির বিশ্লেষণ অ্যাপÑ সবকিছু ব্যবহার করে খুব সহজেই কৃষক জানতে পারেন জমির অবস্থা ও করণীয়। ঝড়ষধৎ রৎৎরমধঃরড়হ, ফৎরঢ় রৎৎরমধঃরড়হ, ধঁঃড়সধঃরপ রৎৎরমধঃরড়হ পড়হঃৎড়ষষবৎ- এসব প্রযুক্তি পানির অপচয় প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ফলে খরচ কমে এবং ফলন বেড়ে কৃষির লাভজনকতা বাড়ে বহুগুণ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জলবায়ুÑ স্মার্ট কৃষিও এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। লবণ-সহনশীল ধান, খরা-সহনশীল ফসল, ভাসমান কৃষি এবং বর্ষানির্ভর আধুনিক চাষাবাদÑ এসব প্রযুক্তি বাংলাদেশের উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে স্থায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করছে। কৃষি কেবল আধুনিক হচ্ছে না, বরং পরিবেশের সঙ্গে আরও টেকসই ও মানানসই হচ্ছে।

যান্ত্রিকীকরণও কৃষিতে এনেছে এক বিপ্লব। একসময় যে কাজ করতে সারাদিন লেগে যেত, এখন কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রিপার বা ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টাতেই শেষ করা যায়। এতে শ্রমের চাপ কমছে, সময় বাঁচছে এবং উৎপাদন ব্যয়ও কমে আসছে। এসব যন্ত্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ফলে গ্রামে তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান, যা তরুণদের কৃষি খাতে আরও আকৃষ্ট করছে।

নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। সৌরচালিত ধান শুকানো ঘর, সৌর ঠান্ডা কক্ষ, বায়োগ্যাস প্লান্টÑ এসব প্রযুক্তি কৃষিকে আরও সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব করছে। উৎপাদন ক্ষতি কমছে, সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে এবং কৃষিপণ্যের মান বজায় থাকছে দীর্ঘসময়।

ভবিষ্যতের কৃষি আরও আধুনিক হতে চলেছে। রোবটিক্স ও অটোমেশন এখন গবেষণার পর্যায়ে থাকলেও খুব দ্রুতই তা মাঠে ব্যবহৃত হবেÑ স্বয়ংক্রিয় ধান কাটার রোবট, আগাছা পরিষ্কারের রোবট, অটোমেটেড গ্রিনহাউসÑ সবকিছুই উৎপাদনকে আরও দ্রুত, নির্ভুল ও সাশ্রয়ী করে তুলবে।

কৃষির সঙ্গে ডিজিটাল মার্কেটিংও যুক্ত হয়েছে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে। তরুণরা এখন শুধু মাঠেই নয়, অনলাইনেও কৃষিকে তুলে ধরছেন নতুনভাবে। চেল্লো, শপআপের মতো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে কৃষিপণ্য সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমছে এবং কৃষকের আয় বাড়ছে।

তবে স্মার্ট কৃষির সামনে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রযুক্তির খরচ তুলনামূলক বেশি, অনেক এলাকায় ইন্টারনেট বা বিদ্যুৎ সুবিধা সীমিত এবং অনেক কৃষক এখনো প্রযুক্তির ব্যবহারে পুরোপুরি দক্ষ নন। কিন্তু এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কৃষি যে একটি বড় পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে তা নিশ্চিত। নতুন প্রজন্মের আগ্রহ, শেখার মানসিকতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শিতা কৃষিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে।

স্মার্ট কৃষির এই অগ্রগতি শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং গ্রামীণ উন্নয়নের শক্ত ভিত। যে কৃষিকে একসময় অতীতের পেশা মনে করা হতো, সেই কৃষিই আজ প্রযুক্তির হাত ধরে ভবিষ্যতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠছে। তরুণরাই হবে এই পরিবর্তনের চালিকাশক্তি, যারা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মাঠের মাটিকে বদলে দিতে পারে নতুন ভাবনা, উদ্যম ও দক্ষতায়। স্মার্ট কৃষির চাকা যদি তরুণদের হাতে সত্যিকার অর্থে ঘুরতে শুরু করে, তবে বাংলাদেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই হবে নাÑ রপ্তানিতেও গড়ে তুলবে নতুন ইতিহাস।

জিনিয়া তাবাসসুম
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়