ঢাকা সোমবার, ০৮ জুন, ২০২৬

মানচিত্রের ওপারে এক অন্য জীবন

প্রবাসীদের সংগ্রাম, স্বপ্ন ও শিকড়ের উপাখ্যান

আশরাফুল ইসলাম হাসিব
প্রকাশিত: জুন ৮, ২০২৬, ০৬:০৬ এএম

একটি পাসপোর্ট, একটি ভিসা আর উড়োজাহাজের একটি টিকিট ব্যস, বদলে গেল জীবনের পুরো মানচিত্র। বাইরে থেকে দেখলে প্রবাস জীবনকে মনে হতে পারে এক ঝলমলে, আকর্ষণীয় আর সচ্ছলতার গল্প। কিন্তু এই বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা, কঠোর পরিশ্রম আর মানসিক পরিবর্তনের এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা। জন্মভূমির চেনা ধূলিকণা, শৈশবের খেলার মাঠ, মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধুদের চেনা পরিম-ল ছেড়ে যখন একজন মানুষ সম্পূর্ণ অচেনা এক ভৌগোলিক পরিবেশে পাড়ি জমায়, তখন তার জীবনের প্রতিটি দিনই হয়ে ওঠে এক নতুন পরীক্ষা।

প্রবাস জীবন মানে কেবলই অর্থ উপার্জন নয়; প্রবাস জীবন মানে প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ এবং এক টুকরো বাংলাদেশের জন্য বুকের ভেতর অবিরত হাহাকার।

হারিয়ে যাওয়া সকাল ও যান্ত্রিকতার চাকা

দেশ ছাড়ার পর প্রবাসীদের জীবনে যে পরিবর্তনটি সবচেয়ে প্রথমে এবং নির্মমভাবে আঘাত করে, তা হলোÑ সকালের চিরচেনা আবহ হারিয়ে যাওয়া। দেশে থাকতে যে সকালটা শুরু হতো মায়ের হাতের গরম নাস্তা কিংবা পরিবারের সবার সঙ্গে বসে এক কাপ চায়ের স্নিগ্ধ আড্ডায়, প্রবাসে এসে সেই সকালটা হয়ে যায় যান্ত্রিক।

এখানে ঘুম থেকে উঠতে হয় অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে। বিছানা ছাড়ার পর থেকেই শুরু হয় ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ। নিজের জন্য নাস্তা তৈরি করা, দুপুরের খাবার প্যাক করা এবং ঠিক সময়ে কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়াÑ সবকিছুই চলে এক কঠোর মিলিটারি শৃঙ্খলায়।

বিদেশের অফিস জীবন ভীষণ প্রতিযোগিতাপূর্ণ। সেখানে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই; নিজেকে প্রতিনিয়ত দক্ষ, সময়নিষ্ঠ ও আপ-টু-ডেট রাখতে হয়। সহকর্মীদের সঙ্গে পেশাদারি খাতিরে ছোটখাটো আলাপ বা ‘হাই-হ্যালো’ হলেও, দেশের চায়ের দোকানের সেই প্রাণখোলা হাসি বা বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্থহীন কিন্তু আনন্দময় আড্ডার শূন্যতা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।

স্বাবলম্বী হওয়ার আড়ালে লুকানো ক্লান্তি

ব্যক্তিগত জীবনে প্রবাস এক পরম শিক্ষক, যা মানুষকে শতভাগ আত্মনির্ভরশীল করে তোলে। দেশে থাকতে যারা হয়তো এক গ্লাস পানিও নিজে ঢেলে খাননি, প্রবাসে এসে তাদেরই রান্নাঘর সামলাতে হয়, ঘর পরিষ্কার করতে হয়, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে সপ্তাহের বাজারÑ সব এক হাতে করতে হয়।

যারা একা থাকেন তাদের কষ্ট একরকম, আর যারা পরিবার নিয়ে থাকেন তাদের চ্যালেঞ্জটা আরও ভিন্ন ও বহুমাত্রিক। কর্মক্ষেত্রের চাপ সামলে সন্তানদের রুটিন বজায় রাখা এক বিশাল যুদ্ধ।

সন্তানদের সময়মতো স্কুলে পৌঁছে দেওয়া ও নিয়ে আসা। পড়াশোনার তদারকি করা। তাদের সামাজিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য সাঁতার, নাচ, সংগীত বা ফুটবল ক্লাসে নিয়ে যাওয়া।

ছুটির দিনগুলোও কাটে ডাক্তার দেখানো, সন্তানের স্কুলের ‘প্যারেন্টস মিটিং’ বা সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর জন্য বাজার-সদাই করে রাখার ব্যস্ততায়। ফলে ‘নিজের জন্য একটু সময়’Ñ এই ধারণাটি প্রবাসীদের অভিধানে এক ধরনের বিলাসিতা মাত্র।

রেমিট্যান্সের পেছনের কঠোর অর্থনীতি

বিদেশের মাটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী। বাড়ি ভাড়া, ইউটিলিটি বিল, যাতায়াত খরচ আর ট্যাক্স দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা নিয়ে চলতে হয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনায়। প্রতিটি পাউন্ড, ডলার বা রিয়াল খরচের পেছনে থাকে অনেক হিসাব-নিকাশ।

সবচেয়ে বড় ত্যাগটি স্বীকার করেন তারা, যারা দেশে থাকা পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চান। নিজের একটি ভালো পোশাক, রেস্তোরাঁয় গিয়ে ভালো কিছু খাওয়ার ইচ্ছা বা নিজের বিনোদনের বাজেট কাটছাঁট করে প্রবাসীরা প্রতি মাসে দেশে টাকা পাঠান। দিনশেষে যখন ক্লান্ত-বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে তারা ঘরে ফেরেন, তখন নিজের জন্য আলাদা করে কিছু করার মতো শারীরিক শক্তি বা মানসিক উদ্যম অবশিষ্ট থাকে না।

একাকিত্বের মেঘ ও খাপ খাইয়ে নেওয়ার যুদ্ধ

নতুন প্রবাসীদের জন্য শুরুর দিনগুলো এক মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়। সম্পূর্ণ নতুন আবহাওয়া, ভিন্ন সংস্কৃতি এবং অনেক ক্ষেত্রে ভাষাগত বাধাÑ সব মিলিয়ে এক গভীর একাকিত্ব গ্রাস করে। দেশে কোনো উৎসব হলে বা পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে প্রবাসীদের মন ভালো থাকে না, বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। কিন্তু কান্নার জন্যও যে একটু সময় বা কাঁধ দরকার, প্রবাসে তাও সহজে মেলে না।

তবে মানুষ পরিবেশের দাস। এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেই প্রবাসীরা ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নিতে শেখেন। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে বাড়ে তাদের আত্মবিশ্বাস। তারা বুঝতে শেখেন যে, এখানে প্রতিটি মিনিট মূল্যবান এবং নিজের সমস্যার সমাধান নিজেকেই করতে হবে। এই লড়াইটাই একসময় তাদের পরিণত ও বাস্তববাদী মানুষে রূপান্তর করে।

প্রবাসের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ : সংস্কৃতির মেলবন্ধন

সব কষ্ট আর যান্ত্রিকতার মাঝেও প্রবাস জীবন একেবারে মরুভূমি নয়। এর কিছু সুন্দর ও ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বিভিন্ন দেশের ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ থাকায় প্রবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক উদার ও বৈশ্বিক হয়। নতুন খাবার, নতুন পোশাক এবং ভিন্ন উৎসবের সঙ্গে পরিচিত হওয়া জীবনকে সমৃদ্ধ করে।

সবচেয়ে চমৎকার আবহ তৈরি হয় যখন বাঙালিরা প্রবাসের মাটিতে নিজেদের উৎসবগুলো উদযাপন করেন। ঈদ, পূজা, দুর্গাপূজা কিংবা পহেলা বৈশাখে নারীরা শাড়ি আর পুরুষেরা পাঞ্জাবি পরে যখন সমবেত হন, তখন কিছুক্ষণের জন্য হলেও বিদেশের যান্ত্রিক শহরটি এক টুকরো বাংলাদেশে পরিণত হয়। এই আয়োজনগুলোই প্রবাসীদের বেঁচে থাকার এবং কাজ করার নতুন শক্তি জোগায়।

শিকড়ের টান আর অন্তহীন অপেক্ষা

প্রবাস জীবন একটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং শিক্ষার নাম। এখানে যেমন অনেক প্রাপ্তি আর সাফল্যের গল্প আছে, তেমনি সেই সাফল্যের প্রতিটি ইটের নিচে চাপা পড়ে থাকে অনেক দীর্ঘশ্বাস, অনেক না-বলা বেদনা।

বিদেশের মাটিতে যত অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, আধুনিক নাগরিক সুবিধা কিংবা নাগরিকত্বই থাকুক না কেন, প্রবাসীদের হৃদয়ের একটি বড় অংশ সবসময় পড়ে থাকে বাংলাদেশের মাটিতে। তারা ডলারে আয় করতে পারেন, কিন্তু তাদের আবেগটা সবসময় খাটি বাংলায় স্পন্দিত হয়।

সুযোগ পেলেই দেশে ছুটে যাওয়ার, চেনা পথে হাঁটার আকুলতা তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। আর এই অন্তহীন ব্যস্ততা ও ক্লান্তির মাঝেও প্রতিটি প্রবাসী প্রতি রাতে ঘুমাতে যান একটি সুন্দর স্বপ্ন বুকে নিয়েÑ একদিন সব দায়িত্ব শেষ হবে, কেটে যাবে পরবাসের এই দীর্ঘ প্রহর। তারা আবার ফিরে যাবেন নিজের শিকড়ে, নিজের দেশে; মায়ের হাতের চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শুরু করবেন এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও চিরচেনা সকাল।

লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবাসী