সোনার হরিণ ধরার অদম্য আকাক্সক্ষা, পরিবারের মুখে একটুখানি হাসি ফোটানোর স্বপ্ন আর উন্নত জীবনের আশায় প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি পাড়ি জমান দূর পরবাসে। জমিজমা বিক্রি, চড়া সুদে ঋণ কিংবা শেষ সম্বল বন্ধক রেখে দালালদের হাতে তুলে দেন লাখ লাখ টাকা। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই এই স্বপ্নযাত্রার পরিণতি হয় অত্যন্ত করুণ ও নির্মম। অবৈধ দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে, ভুয়া ভিসা কিংবা চুক্তির চেয়ে কম বেতনের ফাঁদে পড়ে বিদেশের মাটিতে তারা শিকার হন চরম প্রতারণা ও নির্যাতনের। শেষ পর্যন্ত তীব্র মানসিক ও শারীরিক ক্ষত নিয়ে, সম্পূর্ণ শূন্যহাতে তাদের দেশে ফিরে আসতে হয়। বিমানবন্দর টার্মিনালে যখন তারা পা রাখেন, তখন তাদের চোখে থাকে না কোনো অর্জনের আনন্দ, বরং থাকে ঋণের বোঝা আর অন্ধকারের এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
প্রতারণার জাল ও শূন্যহাতে প্রত্যাবর্তনের বেদনা
বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে সক্রিয় এক শ্রেণির অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি এবং স্থানীয় দালাল চক্র প্রবাসীদের সরলতার সুযোগ নেয়। ভালো চাকরি, উচ্চ বেতন এবং চমৎকার সুযোগ-সুবিধাজনক কাজের লোভ দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয় তাদের। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পরেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। আকামা বা কাজের বৈধ পারমিট না দেওয়া, মাসের পর মাস বেতন না দিয়ে খাটিয়ে নেওয়া, এবং পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে বন্দি দশায় রাখার মতো ঘটনা নিত্যদিনের। পরবর্তীতে পুলিশের হাতে আটক হয়ে কিংবা কোনো রকমে জীবন বাঁচিয়ে আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। এই জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তন শুধু একজন ব্যক্তির ফিরে আসা নয়, বরং একটি পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদ- ভেঙে যাওয়ার গল্প।
সরকারি উদ্যোগ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম
প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য সরকারের ‘প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়’ এবং ‘ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড’ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:
তাৎক্ষণিক আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা : বিদেশ থেকে শূন্যহাতে বা অসুস্থ অবস্থায় ফিরে আসা কর্মীদের বিমানবন্দরেই জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা এবং বাড়ি ফেরার জন্য যাতায়াত ভাতা প্রদান করা হয়। এ ছাড়া মৃত বা গুরুতর আহতদের জন্য বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা রয়েছে।
পুনর্বাসন ঋণ : প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত স্বল্প সুদে এবং সহজ শর্তে বিশেষ পুনর্বাসন ঋণ প্রদান করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলোÑ ফিরে আসা কর্মীরা যেন দেশে ছোটখাটো ব্যবসা, গবাদি পশু পালন বা কৃষিকাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারেন।
মানসিক ও আইনি কাউন্সেলিং : চরম ট্রমা এবং মানসিক নির্যাতন সহ্য করে আসা প্রবাসীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, দোষী দালাল বা এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিনা মূল্যে আইনি সহায়তাও দেওয়া হয়।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশীয় বাজারে সুযোগ
প্রতারণার শিকার প্রবাসীদের কেবল ঋণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়, তাদের দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার বর্তমানে তাদের জন্য দেশীয় শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বেশ কিছু সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
বিদেশে কাজ করার সুবাদে অনেক কর্মী নির্দিষ্ট কিছু কাজে (যেমন- কনস্ট্রাকশন, ওয়েল্ডিং, ড্রাইভিং, প্লাম্বিং বা কেয়ারগিভিং) বেশ দক্ষ হয়ে ওঠেন। তাদের এই বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে দেশের বড় বড় মেগা প্রজেক্ট এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে তাদের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সনদের আওতায় আনা হচ্ছে, যা দেশের বাজারে ভালো বেতনে চাকরি পেতে সাহায্য করে।
বাস্তবতার নিরিখে চ্যালেঞ্জ : সরকারি পর্যায় থেকে নানা ধরনের ঋণের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নথিপত্রের দীর্ঘসূত্রতা এবং তথ্যের অভাবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা অনেক সময় এই সুবিধার বাইরে থেকে যান। এই প্রক্রিয়ার সহজীকরণ এখন সময়ের দাবি।
টেকসই পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সহযোগিতা
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা, ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা প্রতারিত প্রবাসীদের টেকসই পুনর্বাসনে কাজ করছে। তারা সমাজভিত্তিক পুনর্বাসন মডেলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের সরাসরি হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু, ক্ষুদ্র ব্যবসার কাঁচামাল কিনে দিচ্ছে, যাতে করে নগদ টাকার অপচয় না হয়ে সরাসরি আয়ের উৎস তৈরি হয়। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই ফিরে আসা প্রবাসীরা নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারছেন।
বিদেশের মাটিতে প্রতারিত হয়ে ফিরে আসা নাগরিকরা করুণার পাত্র নন, তারা আমাদেরই ভাই-বোন এবং দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাদের টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হলে সরকারি সহায়তার পরিধি আরও বাড়াতে হবে এবং ঋণের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে, ভবিষ্যতে আর কোনো কর্মীকে যেন এমন পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়, সেজন্য মানবপাচারকারী ও ভুয়া লাইসেন্সধারী দালাল চক্রের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশেই পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারলেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

