ঢাকা সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

স্বপ্নের প্রবাস বাস্তবের অনিশ্চয়তা

মিনহাজুর রহমান নয়ন
প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ০৩:০৩ এএম

উন্নত আয়ের আশায় প্রতি বছর লাখো বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, ওমান, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, গ্রিস, লিবিয়া হয়ে ইউরোপগামী বিভিন্ন রুটসহ নানা দেশে তারা নির্মাণ, উৎপাদনশিল্প, কৃষি, সেবা ও গৃহকর্মীসহ বিভিন্ন পেশায় কাজ করেন। এসব শ্রমিকের বড় একটি অংশ বৈধভাবে কর্মসংস্থানে যুক্ত থাকলেও অনেকে ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট বা অভিবাসনসংক্রান্ত জটিলতায় পড়ে সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হন।

বিভিন্ন দেশে নিয়মিত অভিবাসন অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে শত শত বাংলাদেশি আটক হওয়ার খবর প্রায়ই প্রকাশিত হয়। তবে আটক হওয়া সবাই অপরাধী নন। অনেকেই নিয়োগকর্তার অবহেলা, দালালচক্রের প্রতারণা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আইনি সমস্যায় পড়েন। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের রাখা হয় অভিবাসন আটককেন্দ্র বা ডিটেনশন সেন্টারে।

কোন কোন দেশে বাংলাদেশিরা বেশি আটক হন?

বাংলাদেশিদের আটকের ঘটনা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর এবং অভিবাসন সংকটপ্রবণ কিছু ইউরোপীয় দেশে। এ ছাড়া লিবিয়া, তুরস্ক বা ভূমধ্যসাগরীয় অনিয়মিত অভিবাসন রুট ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করা অনেক বাংলাদেশিও বিভিন্ন দেশের সীমান্ত বা আটককেন্দ্রে অবস্থান করেন।

কেন আটক হন বাংলাদেশিরা?

প্রায় সব দেশেই বিদেশি কর্মীদের জন্য কঠোর অভিবাসন আইন রয়েছে। এসব আইন লঙ্ঘন করলে আটক, জরিমানা, কারাদ- কিংবা বহিষ্কারের মুখে পড়তে হয়।

বাংলাদেশিদের আটকের সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশে অবস্থান করা (ওভারস্টে)
  • বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করা
  • অনুমোদিত নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করা
  • পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলা বা সঙ্গে না রাখা
  • অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম বা অনিয়মিতভাবে দেশে প্রবেশ
  • জাল বা ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার
  • অবৈধ দালালের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়া
  • চাকরি ছেড়ে দীর্ঘদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকা

অনেক সময় শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে জানতে পারেন, প্রতিশ্রুত চাকরি বা ওয়ার্ক পারমিটের কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে বৈধভাবে গেলেও নিয়োগকর্তা সময়মতো ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন না করায় শ্রমিক অনিচ্ছাকৃতভাবে অবৈধ অবস্থানে চলে যান।

নিয়োগকর্তার অবহেলাও বড় কারণ

সব দায় শ্রমিকের নয়। অনেক দেশে নিয়োগকর্তার দায়িত্ব থাকে কর্মীর ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট নবায়ন করা। কিন্তু কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তা সময়মতো করে না। অনেক নিয়োগকর্তা শ্রমিকের পাসপোর্ট নিজেদের কাছে রেখে দেন। ফলে অভিযানের সময় শ্রমিক বৈধ নথি দেখাতে না পারলে তাকেই আটক করা হয়।

আবার কাজ হারানোর পর অনেকে নতুন কাজের সন্ধানে অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। এতে তাদের কর্মসংস্থানের বৈধতা নষ্ট হয় এবং তারা আইনি ঝুঁকিতে পড়েন।

আটক হওয়ার পর কী ঘটে?

আটকের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অভিবাসন বিভাগ পরিচালিত আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে সাধারণত পরিচয় যাচাই, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আঙুলের ছাপ ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হয়। যাদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না, তাদের বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

আটককেন্দ্রে জীবন কেমন?

অভিবাসন আটককেন্দ্রে জীবন সহজ নয়। সেখানে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হয় এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত থাকে। আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেককে কয়েক সপ্তাহ, কখনো কয়েক মাসও সেখানে থাকতে হয়।

বেশির ভাগ দেশে মৌলিক খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘদিন আটক অবস্থায় থাকার কারণে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার কষ্ট অনেকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনের ভূমিকা

যে দেশেই বাংলাদেশি আটক হন না কেন, সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশন তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা দেওয়া এবং দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

যাদের পাসপোর্ট নেই বা হারিয়ে গেছে, তাদের জন্য জরুরি ভ্রমণ নথি (ট্রাভেল পাস) ইস্যুর ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বহিষ্কার বা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

কীভাবে দেশে ফেরেন আটক বাংলাদেশিরা?

আটক হওয়ার পরই কাউকে দেশে পাঠানো হয় না। সাধারণত কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়।

প্রথমে পরিচয় যাচাই করা হয়। এরপর প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশন ট্রাভেল পাস ইস্যু করে। সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বহিষ্কারের অনুমোদন দেয়। এরপর বিমান টিকিটের ব্যবস্থা করা হয় এবং নির্ধারিত ফ্লাইটে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

অনেক ক্ষেত্রে টিকিটের খরচ শ্রমিক বা তার পরিবার বহন করে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট দেশের বিশেষ কর্মসূচির আওতায় এই ব্যয় বহন করা হয়।

দেশে ফেরার পর কী অপেক্ষা করে?

বাংলাদেশে ফিরে অনেকেই নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করেন। কেউ পুনরায় বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন, আবার কেউ দেশে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করেন।

তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাদের অনেক দেশ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পুনঃপ্রবেশে নিষেধাজ্ঞা (ব্ল্যাকলিস্ট) দেয়। ফলে ভবিষ্যতে সেই দেশে কাজের সুযোগ হারানোর ঝুঁকি থাকে।

কীভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা এবং বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই অধিকাংশ ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। বিদেশ যাওয়ার আগে সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া উচিত। সব সময় বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট নিজের কাছে রাখা প্রয়োজন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা নবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। চাকরি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে করতে হবে। কোনো সমস্যায় পড়লে দালালের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের সহায়তা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

সচেতনতার বিকল্প নেই

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত অধিকাংশ বাংলাদেশিই কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। কিন্তু কিছু শ্রমিক আইনি জটিলতায় পড়ে অভিবাসন আটককেন্দ্রে যেতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে ব্যক্তিগত ভুলের পাশাপাশি দালালচক্রের প্রতারণা, নিয়োগকর্তার অবহেলা এবং সঠিক তথ্যের অভাব বড় ভূমিকা রাখে।

প্রবাস জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈধ কাগজপত্র সংরক্ষণ, সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইন সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং সরকারি অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় বিদেশে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সচেতনতা বাড়লে যেমন আটক হওয়ার ঘটনা কমবে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি কর্মীদের সুনাম ও মর্যাদাও আরও সুদৃঢ় হবে।